২৬ দিনে ব্যাংক থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার

নতুন অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম মাসের (জুলাই) ২৬ দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে আট হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। তবে এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নেয়নি।

বরং আগের দেনা বাবদ পরিশোধ করেছে দুই হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ফলে জুলাই মাসে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন  বলেন, এভাবে ঋণ নেয়ায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে।

কারণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। সরকারের বিদেশি সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এসব লক্ষ্যে পৌঁছানো শুধু কঠিনই নয়, অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবও নয়।

আবার সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের চাপ আরও বাড়বে। ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ানোরও আশঙ্কা রয়েছে। যদিও লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি।

জানা যায়, বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছরই ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় সরকার। তবে গত অর্থবছর থেকে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেই চলেছে। এজন্য সমাপ্ত অর্থবছরে সরকারি ঋণের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত সরকার পৌঁছে যায় সেই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। ঋণের এই অঙ্ক আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১০৯ শতাংশ বেশি।

রাজস্ব আদায়ে নাজুক অবস্থা এবং সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে যাওয়ায় গত অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের বেশি ঋণ নেয়ার প্রবণতা ছিল। তার মধ্যে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে অর্থনীতির সব হিসাব এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় ঋণনির্ভরতা আরও বেড়েছে। নতুন অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ সরকারের ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক; যা বাজেটে নির্ধারণ করেছে সরকার।

২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা ছিল। তবে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮২ হাজার ৪২১ কোটি টাকা করা হয়। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

গত ২৯ জুলাই ওয়েবসাইটে নতুন মুদ্রানীতি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যার মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুনে সেই প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি চলতি মুদ্রানীতিতে প্রক্ষেপিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ কম; যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।

এদিকে সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগে ঝুঁকছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কারণ এজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নানা লোভনীয় অফার দিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে নতুন মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদহার আরও এক দফা কমানো হয়েছে।

ব্যাংকগুলো যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদহার ঠিক হয় রেপোর মাধ্যমে। মুদ্রানীতিতে রেপোর হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে।

রিভার্স রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ জমা রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। এক্ষেত্রে সুদহার ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। রেপো বা রিভার্স রেপোর মাধ্যমে সাধারণত এক দিনের জন্য ধার করা বা জমা রাখা হয়।

একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদহারকে বলা হয় নীতি সুদহার (পলিসি রেট)। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে। রেপোর সুদ কমলে ব্যাংকগুলো কম খরচে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তহবিল পাবে।

তাতে তারা কম সুদে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের ঋণ দিতে পারবে। অন্য দিকে রিভার্স রেপোর সুদহার কমানোর অর্থ হলো, ব্যাংকগুলোকে চাপ দেয়া, যাতে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা ফেলে রেখে মুনাফা না তুলে ব্যবসা ও উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ায়।