২০শে আগস্ট ১৯৭১, বিমান ছিনতাইয়ের আগে প্রিয়তমা স্ত্রী মিলিকে লেখা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান’র শেষ চিঠি:

“প্রিয়তমা মিলি,
একটা চুম্বন তোমার পাওনা রয়ে গেলো, সকালে প্যারেডে যাবার আগে তোমাকে চুমু খেয়ে বের না হলে আমার দিন ভালো যায় না । আজ তোমাকে চুমু খাওয়া হয়নি । আজকের দিনটা কেমন যাবে জানিনা, এই চিঠি যখন তুমি পড়ছো, আমি তখন তোমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে । ঠিক কতটা দূরে আমি জানি না ।

মিলি, তোমার কি আমাদের বাসর রাতের কথা মনে আছে? কিছুই বুঝে উঠার আগে বিয়েটা হয়ে গেলো । বাসর রাতে তুমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে যখন কাঁদছিলে, আমি তখন তোমার হাতে একটা কাঠের বাক্স ধরিয়ে দিলাম । তুমি বাক্সটা খুললে, সাথে সাথে বাক্স থেকে ঝাকে ঝাকে জোনাকি বের হয়ে সারা ঘরময় ছড়িয়ে গেলো । মনে হচ্ছিলো আমাদের ঘরটা একটা আকাশ, আর জোনাকিরা তারার ফুল ফুটিয়েছে!
কান্না থামিয়ে তুমি নির্বাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলে, “আপনি এত পাগল কেনো!?

মিলি, আমি আসলেই পাগল, নইলে তোমাদের এভাবে রেখে যেতে পারতাম না । মিলি, আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন প্রিয় কন্যা মাহিনের জন্মের দিনটা । তুমি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলে । বাইরে আকাশ ভাঙা বৃষ্টি, আমি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কষ্টে পুড়ে যাচ্ছি । অনেকক্ষণ পরে প্রিয় কন্যার আরাধ্য কান্নার শব্দ । আমার হাতের মুঠোয় প্রিয় কন্যার হাত!

এরপর আমাদের সংসারে এলো আরেকটি ছোট্ট পরী তুহিন। মিলি, তুমি কি জানো, আমি যখন আমার প্রিয় কলিজার টুকরো দুই কন্যাকে এক সাথে দোলনায় দোল খেতে দেখি, আমার সমস্ত কষ্ট -সমস্ত যন্ত্রণা উবে যায় । তুমি কি কখনো খেয়াল করেছো, আমার কন্যাদের শরীরে আমার শরীরের সূক্ষ্ম একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়? মিলি, আমাকে ক্ষমা করে দিও ।

আমার কন্যারা যদি কখনো জিজ্ঞেস করে, “বাবা কেন আমাদের ফেলে চলে গেছে?” তুমি তাদের বলবে, “তোমাদের বাবা তোমাদের অন্য এক মা’র টানে চলে গেছে, যে মা’কে তোমরা কখনো দেখোনি । সে মা’র নাম “বাংলাদেশ” । মিলি, আমি দেশের ডাককে উপেক্ষা করতে পারিনি । আমি দেশের জন্য আজকে ছুটে না গেলে আমার মানব জন্মের জন্য সত্যিই কলঙ্ক হবে ।

আমি তোমাদের যেমন ভালোবাসি, তেমনি ভালোবাসি আমাকে জন্ম দেওয়া দেশটিকে । যে দেশের প্রতিটা ধূলিকণা আমার চেনা । আমি জানি, সে দেশের নদীর স্রোত কেমন । একটি পুঁটি মাছের হৃৎপিণ্ড কতটা লাল । ধানক্ষেতে বাতাস কিভাবে দোল খেয়ে যায় । এই দেশটাকে হানাদাররা গিলে খাবে, এটা আমি কি করে মেনে নিই? আমার মায়ের আচল শত্রুরা ছিড়ে নেবে, এটা আমি সহ্য করি কিভাবে মিলি?

আমি আবার ফিরবো মিলি । আমাদের স্বাধীনতার পতাকা বুক পকেটে নিয়ে ফিরবো । আমি, তুমি, মাহিন ও তুহিন, বিজয়ের দিনে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়াবো সবাই । তোমাদের ছেড়ে যেতে বুকের বামপাশে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে । আমার মানিব্যাগে আমাদের পরিবারের ছবিটা উজ্জ্বল আছে । বেশি কষ্ট হলে খুলে দেখবো বারবার । ভালো থেকো মিলি । ফের দেখা হবে । আমার দুই নয়ণের মণিকে অনেক অনেক আদর ।
ইতি,
মতিউর ।

২০শে আগস্ট, শুক্রবার, ১৯৭১ ৷”

সেই বুকভরা আশা নিয়ে মতিউরের আর দেশে ফেরা হয়নি ৷ স্বাধীনতার সবুজ পতাকা বুক পকেটে নিয়ে ঘোরা হয়নি ৷ প্রিয়তমা স্ত্রী, পরিবার ও দেশের মানুষের সাথে আর দেখা করা হয়নি ৷ দেশের মাটিতে তাঁর আর পা রাখা হয়নি ৷ দেশে ফেরার স্বপ্ন তাঁর পূরণ হয়েছে মৃত্যুর পর! স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পরে, পাকিস্তানের সেই “ইধার সো রাহা হে ইক গাদ্দার” লেখা কবর থেকে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে জুন, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান’র দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে বাংলার মাটিতে চিরনিদ্রায় শয়িত করা হয়েছে ৷ বাংলার সূর্যসন্তান ঠাঁই পেয়েছে বাংলার কোলে ৷

চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজনকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ স্বীকৃতিতে ভূষিত করা হয়েছে, মতিউর রহমান তাঁদের একজন ৷ তিনি বাঙালির সূর্যসন্তান ৷ আমাদের গর্ব ৷

গতকাল ২০ আগস্ট ছিলো বীরশ্রেষ্ঠ শহিদ মতিউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী। এই দিনে এই বীরকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্যালুট ৷

সংরক্ষনঃ – বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র।

——–

বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান (২৯ অক্টোবর ১৯৪১ – ২০ আগস্ট ১৯৭১) বাংলাদেশের একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীর শ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের অন্যতম।

(সংগৃহীত)