‘হায়রে ভজনালয়’!

“হায়রে ভজনালয়,

তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়”

-নজরুল

ভণ্ড ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে ক্রোধে ক্ষোভে এতো বিস্ফোরিত হননি আর কোনও কবি লেখক। তবে সে ছিল ব্যক্তির ভণ্ডামী। এখন নজরুল ফিরে এলে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-সিনাগগ নিয়ে রাষ্ট্রের কাণ্ডকারখানা দেখে হয়ত বিস্ময়ে পাথর হয়ে যেতেন, হয়ত সময়ের আগেই তার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যেত।

ক. ক’দিন আগে লাহোরে শিখ উপাসনালয় ঐতিহাসিক গুরুদুয়ারা “নানক শাহি”-কে মসজিদে রূপান্তর করছে পাকিস্তান সরকার।

খ. ঘটনাটিকে ভারত “গুরুতর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে” এবং খুবই গোস্সা করে নয়াদিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনে “কড়া প্রতিবাদ” জানিয়েছে। ভারত সরকার তীব্র স্মৃতিভ্ৰংশ রোগে ভুগছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। মাত্র কমাস আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সে ঐতিহ্যবাহী বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই ভাঙ্গাগড়ার ছবি ও খবর প্রকাশিত হবে সর্বত্র, চিরকাল থেকে যাবে ইন্টারনেটে। বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়েছেন অনেকেই। তাদেরকে কে বোঝাবে ওটা কোনো বিজয় নয়, ওটা ইলোরা-অজন্তা-হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো-ময়নামতি-পাহাড়পুর-মহাস্থানগড়ের প্রাচীন সভ্যতার পরাজয়।

গ. ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের জন্ম হবার আগে থেকেই সেখানে অনেক মসজিদ ছিল। ইসরায়েলের নিষিদ্ধ সংগঠন “ইসলামিক মুভমেন্ট”-এর ডেপুটি নেতা শেখ কামাল খতিবের গবেষণা থেকে “মুসলিম মিরর” মিডিয়া জানাচ্ছে ইসরায়েল:

প্রায় ৪০টি মসজিদ ধ্বংস, বন্ধ বা নিষিদ্ধ করেছে,

কমপক্ষে ১৫টি মসজিদকে সিনাগগ বানিয়েছে,

১৭টি মসজিদকে রেস্টুরেন্ট, মদ্যপানের বার ও মিউজিয়াম বানিয়েছে। এর মধ্যে আছে আল-জাদিদ, আইন হাদ ও আল-সিকসিক মসজিদকে মদ্যপানের বার এবং আল-আহমার মসজিদকে কনসার্ট হলে পরিণত করা হয়েছে।

ওই অঞ্চলে ক্রমাগত যুদ্ধে যেসব মুসলিম পরিবার অন্য দেশে চলে গিয়েছিল, ইসরায়েল আইন বানিয়ে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে যার মধ্যে অনেক মসজিদ ছিল।

লক্ষ্যণীয়, জাতিসংঘে ৫৭টি মুসলিম দেশের শক্তিশালী সংগঠন ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন)-এর শক্তিশালী উপস্থিতি আছে। ইসরায়েলের এই ইসলাম-বিরোধী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তার কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ বা জাতিসংঘে কোনো উদ্যোগের খবর আমরা পাইনি। এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের অগণিত আলেম-মওলানারাও তাদের ওপর কেন চাপ সৃষ্টি করেননি সেটাও স্পষ্ট নয়।

ঘ. এবারে তুরস্ক। ১৪৫৩ সালে তুরস্ক-বিজয়ী সুলতান ফাতিহ মুহাম্মদ কনস্টান্টিনোপলে বিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংখ্যাগুরু খ্রীস্টানদের সর্বোচ্চ ভজনালয় হায়া সোফিয়াকে (যা আমাদের কাবা পোপের ভ্যাটিক্যান শিখদের স্বর্ণমন্দিরের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ উপাসনালয়) মসজিদে রূপান্তরিত করেন। ওটা নাকি তিনি কিনেছিলেন। কার কাছ থেকে কিনেছিলেন? কাবা, ভ্যাটিক্যান, স্বর্ণমন্দির, এগুলো কি বিক্রি করা যায়? কেনা যায়? পরিচালনা কমিটি উপাসনালয় গুলোর খাদেম মাত্র, মালিক নন। সৌদি বাদশা যেমন কাবা শরীফের “খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন”, ঠিক তেমনি।

১৯৩৫ সালে কামাল আতাতুর্ক সেটাকে জাদুঘর করেছিলেন, এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সরকার সেটা মসজিদ করেছে। বিজয়ের উল্লাসে ফেটে পড়েছেন মুসলিম-বিশ্বের অনেকেই। তাঁরা খেয়াল করছেন না তুরস্কের এ সিদ্ধান্ত ভারতের বাবরি-গ্রাস ও ইসরায়েলের মসজিদ-গ্রাসকে বৈধ করে দিল, সেইসাথে বর্তমান মসজিদগুলোকেও বিপদের মধ্যে ফেলে দিল। নিজে কাঁচের ঘরে বাস করে অন্যের ঘরে ঢিল ছোঁড়া ঠিক নয়। তারা খেয়াল করছেন না ইসলামের বিজয় ন্যায়বিচার ও শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে, কোর্ট-কাচারি করে ইমারত দখলের মধ্যে নয়। ইস্তানবুল শহরে অসংখ্য মসজিদ আছে, ১৬১০ সালের দিকে বানানো সুলতান আহমেদ মসজিদ (The Blue mosque) একাই ১০ হাজার মুসল্লি ধারণ করতে পারে। তার পরেও হায়া সোফিয়াকে জাদুঘর থেকে মসজিদ বানানোটা কোন ইসলামী বা মুসলিম প্রয়োজন ছিলনা, রাজনৈতিক প্রয়োজন থাকতে পারে।

ভারতে বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির বানানোর সিদ্ধান্তের পর আমরা কি হাজার কণ্ঠের উল্লসিত হুংকার শুনিনি: “ইয়ে তো সির্ফ ঝাঁকি হ্যায় – কাশী মথুরা বাকি হ্যায়”? ভারতে ইতোমধ্যে সরকারি দলিলে ঐতিহাসিক ‘এলাহাবাদ’ (আল্লাহ আবাদ)- এর নাম হয়ে গেছে ‘প্রয়াগরাজ’, ঐতিহ্যবাহী ‘আহমেদাবাদ’-এর নাম হয়ে গেছে ‘কর্ণাবতী, বাংলা সাহিত্যে বহুল উল্লেখিত বিখ্যাত ‘মুঘলসরাই স্টেশন’- এর নাম হয়ে গেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের নামে ‘দীনদয়াল স্টেশন’, পুরো ফৈজাবাদ জেলার নাম হয়ে গেছে অযোধ্যা জেলা (আগে অযোধ্যা ছিল ফৈজাবাদ জেলার একটি শহরের নাম যেখানে বাবরি মসজিদ আছে) ৷ চেষ্টা চলছে ‘তাজমহল’-কে ‘তেজোমহালয়া’, ‘হায়দ্রাবাদ-কে ‘ভাগ্যনগর’, ‘আগ্রা’-কে ‘অগ্রভান’ বা ‘অগ্রয়াল’, ‘মুজফফর নগর’-কে ‘লক্ষ্মীনগর’ ও ‘আমদাবাদ’কে ‘অমরাবতী’ করার।

গল্প নয়, নয় কল্পনা।

ভারতের অজস্র মসজিদের নিয়তি ঝুলছে এই গুরুতর মুসলিম-বিরোধী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রশক্তির হাতে যাকে আরো শক্তিশালী করেছে তুরস্ক। উদাহরণ দিচ্ছি ওদের ভাষায় “সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ৯টি মন্দির ভেঙে মসজিদ”-এর:

১। রাম জন্মভূমি মন্দির ভেঙে বাবরি মসজিদ,

২। বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দির ভেঙে জ্ঞানভাপি মসজিদ,

৩। মথুরায় কৃষ্ণ জন্মভূমি মন্দির ভেঙে শাহী ইদ্গাহ মসজিদ,

৪। গুজরাটের রুদ্র মহালয়া মন্দির ভেঙে জামী মসজিদ,

৫। মধ্যপ্রদেশে ভোজশালা মন্দির ভেঙে কামাল মৌলানা মসজিদ,

৬। পানডুয়াতে আদিনাথ মন্দির ভেঙে আদিনা মসজিদ,

৭। আহমেদাবাদে ভদ্রকালী মন্দির ভেঙে জামা মসজিদ,

৮। মধ্যপ্রদেশে বিজয় মন্দির ভেঙে বিজামণ্ডল মসজিদ,

৯। দিল্লীর ধ্রুব স্তম্ভ ভেঙে কুতুব মিনার।

কী মনে হয়?

উপাসনালয় হোক বা সীমানা হোক, ওটা আগে আমাদেরই ছিল’ এই ভয়ংকর অন্তহীন চক্রটা মানবতার অবর্ণনীয় ক্ষতি করেছে। ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বরে জার্মান বাহিনীর পোলিশ করিডোর আক্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুটাই হয়েছিল হিটলারের ওই দাবির ভিত্তিতে – “ওটা আগে আমাদেরই ছিল”। দাবিটা মিথ্যে নয়। বাল্টিক সাগরের তীরে পোল্যান্ডের ওই অঞ্চলটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানিরই ছিল। ওখানকার প্রায় সবাই নৃতাত্বিক দিক থেকে জার্মান এবং তারা জার্মান ভাষাতেই কথা বলেন। বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরে গেলে ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ফ্রান্সের ভার্সাই শহরের রাজপ্রাসাদে বসে বিজয়ীরা জার্মানির ওপরে অত্যন্ত বর্বর “ভার্সাই চুক্তি” চাপিয়ে দেয়। ওটা ছিল জার্মানির অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক মৃত্যুসনদ যার ফলে জার্মানি হিটলারের নেতৃত্বে বিদ্রোহে ঘুরে দাঁড়ায় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির ১৪টি ক্লজের একটাতে জার্মানির ওই অঞ্চলটা “পোলিশ করিডোর” নাম দিয়ে পোল্যান্ডকে দেওয়া হয় যাতে পোল্যান্ড বাল্টিক সাগরের সুবিধে পেতে পারে। যুদ্ধে প্রায় আট কোটি লোক খুন হয়, ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ অগাস্ট হিরোশিমা নাগাসাকিতে লক্ষ নিরপরাধের ওপরে আণবিক বোমার হত্যাযজ্ঞ হয়, অগণিত সম্পত্তি ধ্বংস হয়।

কবে না জানি হিজ এক্সেলেন্সি নরেন্দ্র মোদী বলে বসেন- বাংলাদেশ পাকিস্তান আগে আমাদেরই ছিল ওগুলো ফেরৎ চাই ! সেক্ষেত্রে কী বলব আমরা?

মসজিদ-মন্দির-চার্চ-সিনাগগ-গুরুদুয়ারা নিয়ে রাষ্ট্রের এ কালখেলা বন্ধ হোক। সারা দুনিয়ায় ওগুলো যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক, দরকার হলে নুতন বানানো হোক।

ভজনালয় “লইয়া খেলা?

বড় কাল খেলা!

এই বেলা ভেঙে দাও খেলা, নহে তুমি সে খেলার হইবে খেলনা”

বিসর্জন- কবিগুরু।