রোহিঙ্গা সংকট: আন্তর্জাতিক নানামুখী তৎপরতা সত্ত্বেও তিন বছরেও নেই প্রত্যাবর্তনের অগ্রগতি

মিয়ানমারের সরকার ও উগ্র রাখাইন সম্প্রদায়ের অব্যাহত জাতিগত নিপীড়ন ও নির্যাতনের মুখে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জীবন নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আজ থেকে তিন বছর আগে।

এ সময়ের মাঝে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্নমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ ও তৎপরতা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের দেশে ফেরানোর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।

চীনের দূতিয়ালিতে বংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে প্রতাবসন প্রসঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি সই হবার পরও প্রধানত: মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছার অভাব এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নাগরিত্বের মার্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে সেখানে বসবাসের নিশ্চয়তা ছাড়া ফিরে যেতে আস্বীকার করার কারণে প্রত্যাবাসন চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরগুলোকে কারাগারের সাথে তুলনা করে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা এডুকেশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম-এর সাধারণ সম্পাদক জনাব জমির উদ্দিন বলেছেন, মিয়ানমারে তাদের উপর নির্যাতনের তৃতীয় বছর পূর্তিতে কোন প্রকার কর্মসূচীও এবার পালন করতে দেয় নি বাংলাদেশ কর্তপক্ষ।

মিয়ানমারে অবস্থানরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের ওপর সম্ভাব্য গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) নির্দেশ সত্বেও সেখানকার পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয় নি।

এদিকে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের প্রতিবেশী ভারত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত আলোচনায় প্রক্রিয়ায় অংশ নেবার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচীব হংর্ষবর্ধস শ্রিংলা ঢাকা সফরে এসে ভারতের এ আগ্রহের কথা জানিয়ে গেছেন।

এ প্রসঙ্গটিকে ব্যাখ্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ন্তাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড: ইমতিয়াজ আহমেদ  বলেছেন, ভারতের এ আগ্রহ বাংলাদেশকে কতটা সহায়তা করবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারন ভারত নিজেই মিয়ানমারের সাথে আর্থিক ও সামরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। মিয়ানমারের যে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নীপিড়ন করছে, সেই মিয়ানমারকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে ভারত।

তাছাড়া, চীন এর আগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতা জড়িত হয়েছে। চীনের সাথে ভারতের বর্তমান বৈরী সম্পর্কের প্রক্ষাপটে ভারত চাইবে রোহিঙ্গা সমস্যার মধ্যে চীনর প্রভাব খর্ব করতে। এ প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা আলোচনায় জড়িত হবার ব্যাপারে ভারতের আগ্রহকে বুঝতে হবে বলে মনে করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমতিয়াজ।

অপরদিকে, রোহিঙ্গাদের দেশ ত্যাগের তৃতীয় বছর উপলক্ষ্যে গতকাল সোমবার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ (সিপিএস) একটি ওয়েবিনারের (অনলাইন আলোচনা) আয়োজন করে। এতে আংশ নিয়ে মালয়েশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সৈয়দ হামিদ আলবার বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় নয়, এটা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা।

তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা একটি নিরাপত্তা ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না নিলে তাদের মধ্যে সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠবে। আর এ ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হলে চীন বা ভারত কেউই তার প্রভাবের বাইরে থাকবে না। তাই আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থেই চীন ও ভারতকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

এ দিকে রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জোরদার করার জন্য জাতিসঙ্ঘ, আইএনজিও এবং সরকারের কাছে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ)। তারা জানায়, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে সময় লেগেছিল ১০ বছর। যদি ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন যদি শুরুও হয়, তবে তা সম্পন্ন হতে এক দশকেরও বেশি সময় লাগবে, তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অলস অবস্থায় রাখা উচিত নয়, তাদের মানবিক মর্যাদার সুবিধার্থে তাদের জন্য সহজে বহন ও স্থানান্তরযোগ্য ঘর, শিক্ষা, উপার্জনমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত।

বর্তমানে কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরগুলোতে সব মিলিয়ে অন্তত ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে। বছরের পর বছর ধরে এ বিরাট সংখ্যক জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তাছাড়া, রোহিঙ্গাদের কারনে নানামুখী সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রোহিঙ্গাদের অপরাধমুলক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়া, স্থানীয়দের জন্য অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি করা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেভাবেই হোক আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরু করতে হবে। এ জন্য কূটনীতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে ব্যাপকভাবে। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তীসহ পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলোর সহযোগিতা নিতে হবে। নইলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে মানবিক আশ্রয় দিয়ে মারাত্মক বিপর্যয়ে পড়তে হতে পারে বাংলাদেশকে।

আন্তর্জাতিক তৎপরত

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-নির্যাতন বন্ধ, তাদের বাস্তুচ্যুতিরোধ এবং গণহত্যার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট আলামতগুলো সংরক্ষণ করার জন্য মিয়ানমারের প্রতি গত ২৩ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা ওআইসির প্রস্তাবনা অনুযায়ী আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনে। আইসিজেতে রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের বিচার হবে।

অন্যদিকে গণহত্যাসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আলাদাভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলছে। রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান বারবার উপেক্ষা করে চলেছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিচারের আশায় আজো দিন কাটাচ্ছে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গারা।