রাজশাহীতে চেয়ারম্যানের জিম্মা থেকে গ্রামপুলিশ উধাও

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় রফিকুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবককে হত্যার সঙ্গে একজন গ্রামপুলিশের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।

ইতোমধ্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেয়া হয়েছে; কিন্তু লাপাত্তা হয়ে গেছেন রুহুল আমিন নামের ওই গ্রামপুলিশ। ফলে এ হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার সন্দেহ আরও প্রবল হচ্ছে।

রুহুল আমিন গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ইউপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রামপুলিশ। তিনি গা-ঢাকা দেয়ার কারণে এখন ইউপি চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহ বিপদে পড়েছেন।

চেয়ারম্যান বলেন, রুহুল আমিন গা-ঢাকা দিয়েছেন। এ কারণে আমিই সমস্যায় পড়েছি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এখন আমাকেই ধরছে। আমি এখন রুহুল আমিনকে খুঁজে পাচ্ছি না। তার ফোনও বন্ধ।

গত ২২ মার্চ ভোরে গোদাগাড়ীর মাটিকাটা দেওয়ানপাড়া এলাকার পদ্মার চর থেকে রফিকুল ইসলামের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত রফিকুল পদ্মার ওপারের চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোলাডাঙ্গা গাইনাপাড়া গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে।

মরদেহ উদ্ধারের দিন প্রচার চালানো হয়- বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে রফিকুল হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী থানায় হত্যা মামলা করেন।

পরে থানা পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে রফিকুল মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতারও দেখানো হয়। এরপর মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়।

গোদাগাড়ী মডেল থানার ওসি খাইরুল ইসলাম বলেন, যেদিন রফিকুল খুন হন সেদিন তার গ্রামের এক যুবককে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেফতার করা হয়। রফিকুল খুনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাই মাদকের মামলায় তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর মামলাটি পিবিআইতে চলে যায়। এখন মামলার কী অবস্থা তা জানি না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিবিআইয়ের তদন্তে চর আষাড়িয়াদহ ইউপির গ্রামপুলিশ রুহুল আমিনের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য উঠে আসছে। এ কারণে গত চার দিন আগে গ্রামপুলিশ রুহুল আমিন, চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহ এবং ওয়ার্ড সদস্য মাসুদ রানা উজ্জ্বলকে রাজশাহী পিবিআইয়ের কার্যালয়ে ডাকা হয়।

এখানে রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর তাকে চেয়ারম্যানের জিম্মায় ছাড়া হয়। এ সময় পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রয়োজনে রুহুল আমিনকে আবার ডাকা হবে; তখন আসতে হবে। আর তিনি না এলে চেয়ারম্যানই তাকে হাজির করবেন। এরপর বাড়ি ফিরেই লাপাত্তা হয়ে গেছেন গ্রামপুলিশ রুহুল আমিন। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

মঙ্গলবার ইউপি চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহ ওয়ার্ড সদস্য মাসুদ রানা উজ্জ্বল এবং এলাকার আবদুস সাত্তার নামের এক আওয়ামী লীগ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহী গিয়ে পিবিআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন।

তারা গ্রামপুলিশ রুহুল আমিনের লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অবহিত করেন। এ সময় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তাদের আটকে রাখা হয়। পরে তারা প্রতিশ্রুতি দেন- গ্রামপুলিশ রুহুল আমিনকে হাজিরের সব রকম চেষ্টা তারা করবেন। এরপর তারা ছাড়া পান।

এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, লাপাত্তা হয়ে যাওয়া গ্রামপুলিশ রুহুল আমিনও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন চর আষাড়িয়াদহ এলাকার এই গ্রামপুলিশ ভারত থেকে হেরোইন এনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। গ্রামপুলিশ হওয়ার কারণে থানা পুলিশ তাকে কখনও সন্দেহ করেনি। এ সুযোগে মাদকের কারবার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন রুহুল।

রফিকুল খুনের সঙ্গে পিবিআইয়ের তদন্তে তার সম্পৃক্ততা উঠে আসার পর এলাকাবাসী বলছেন, রফিকুল মাদক বহন করতেন। আর গ্রামপুলিশ রুহুল আমিন মাদকের ব্যবসা করেন। রফিকুল হত্যায় গ্রেফতার দেখানো আরেক যুবক হত্যাকাণ্ডের দিনই হেরোইনসহ গ্রেফতার হয়েছেন। তাই ওই হত্যাকাণ্ডে রুহুল আমিনের সম্পৃক্ততা থাকা খুব স্বাভাবিক। রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে থানায় ধর্ষণ চেষ্টার একটি মামলাও আছে।

রুহুল আমিন লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার বিষয়ে হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই জামাল উদ্দিন বলেন, মামলাটির তদন্ত চলছে। কয়েক দিন ধরে আমি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। তাই অফিস যাইনি। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

রাজশাহী পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন, গ্রামপুলিশ রুহুল আমিনকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সেদিন তাকে চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেয়া হয় এবং বলা হয়- ডাকলে তাকে আবার আসতে হবে। কিন্তু বাড়ি গিয়ে সে গা-ঢাকা দিয়েছে। চেয়ারম্যান এসে বিষয়টি জানিয়ে গেছেন। তাকে খুঁজে আনার জন্য চেয়ারম্যানকেও বলা হয়েছে; তবে চেয়ারম্যানকে আটক রাখা হয়নি।