মুক্তিযোদ্ধার বুকে-মুখে লাথি মারে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা

মুক্তিযোদ্ধা ইসাহাক আলী (৭৫)। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে। ৩৫ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন। বুধবার স্ত্রী পারুল বেগমকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে টিকিট নিয়ে প্রথমে ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে যান। এডমিশন স্লিপে লেখা হয়েছে স্ট্রোক। পরে পারুল বেগমকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে। পারুল বেগমের ছেলে রাকিবুল ডাক্তার-নার্সদের কাছে গিয়ে তার মাকে একটু দেখার জন্য হাতজোড় করে অনুরোধ করেন।

কিন্তু কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক তাতে কর্ণপাত করেননি। এ সময় রাকিবুল আরেক শিক্ষানবিস ডাক্তারের কাছে যান। তিনিও রোগীর কাছে আসেননি। এ সময় রাকিবুল উত্তেজিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন।

মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক আলী জানান, চিৎকার শুনে অল্প বয়সী দু’জন ডাক্তার ছুটে এসে ছেলে রাকিবুলকে মারধর শুরু করেন। এ সময় দু’জন স্বাস্থ্যকর্মীও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে আরও ১৫-২০ জন ইন্টার্ন ডাক্তার এসে রাকিবুলকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন।

ছেলেকে রক্ষায় তিনি ও তার বৌমা এগিয়ে গেলে ওই ডাক্তাররা তার ওপরও হামলা করেন। ইসহাক আলী বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিজের পরিচয় দেয়ার পরও কয়েকজন অল্প বয়সী ডাক্তার মিলে আমার বুকে-মুখে-পিঠে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি আর লাথি মারতে শুরু করেন।

আমি মেঝেতে পড়ে গেলে আমাকে টেনেহিঁচড়ে মারতে মারতে একটা ঘরে নিয়ে আটকায়। তখনও আমার ছেলে ও ছেলের বউকে তারা মারধর করছিল।

কিছুক্ষণ পর আমাকে যে ঘরে আটকে রেখেছিল সেখানে আমার ছেলেকেও নিয়ে যায়। এরপর আরও কয়েকজন নেতা গোছের ডাক্তার এসে ঘর খুলে আমার ছেলের সামনে আমাকে আবারও লাথি মারতে শুরু করে।

আমার দাড়ি ধরে টানতে শুরু করে। মুখে ঘুষি মারতে থাকে। আমি তাদের পা ধরে মাফ চাইলেও তারা শুনেনি। এ সময় আমার ছেলে প্রতিবাদ করলে আবারও তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে।

ইসহাক আলী বৃহস্পতিবার নগরীর বোসপাড়ার বাসায় এসব বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে আমার স্ত্রীর কোনো চিকিৎসায় হয়নি। চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেছে। কোনো ডাক্তারই তাকে দেখেননি।

আমার ছেলে ডাক্তার ডাকতে গেলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমি এখন বুকে খুব ব্যথা অনুভব করছি। আমার সারা শরীরে ব্যথা। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। স্ত্রীকে বাঁচাতে না পারলেও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এমন অমানবিক নির্যাতনের কথা কল্পনায়ও ভাবিনি।’

ইসহাক আলীর ছেলে রাকিবুল বলেন, ‘ওদের উন্মত্ত মূর্তি দেখে ওদের ডাক্তার বলে মনে হয়নি। লাঠিসোটা রড নিয়ে এসে আমাদের ঘেরাও করে ওয়ার্ডের ভেতরে। আমার স্ত্রী আমাদের রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তারা তার গায়েও হাত তোলে।

এমন ভয়ংকর ডাক্তাররা হতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আমি মাকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমার বাবাও ঘটনার পর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। আমরা এখন কার কাছে অভিযোগ দেব। আমরা কোন দেশে বসবাস করছি।’

জানা যায়, ঘটনার পর ইন্টার্ন ডাক্তাররা মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক আলীর স্ত্রীর লাশ ৫ ঘণ্টা আটকে রাখে হাসপাতালে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে লাশ ফেরত দেয়। ওই সময় মায়ের লাশ দেখতে না দিয়ে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোক্তার হোসেনের করা মামলায় রাকিবুলকে গ্রেফতার করে রাজশাহীর একটি আদালতে তোলে পুলিশ। পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত রাকিবুলকে জামিনে ছেড়ে দেন। পরে তিনি গ্রামে নিয়ে তার মায়ের লাশ দাফন করেন।

হাসপাতালে একজন মুক্তিযোদ্ধার ও তার পরিবারের ওপর এমন ভয়ংকর নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান।

তিনি বলেন, রামেকে এক শ্রেণির শিক্ষানবিস ডাক্তারের দৌরাত্ম্য খুবই ভয়ংকর। তারা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে এমন আচরণই করে আসছেন কয়েক বছর ধরে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে লাথি-কিল-ঘুষি মেরে আহত করার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে।

জানা যায়, ভর্তির সময় পারুল বেগমের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ উল্লেখ করা হলেও ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছে কার্ডিয়াক রেসপিরেটরি ফেইলর। ইসহাক আলী বলেন, তার স্ত্রীর মৃত্যুর যে কারণ লেখা হয়েছে তাও মনগড়া। নিজেদের অবহেলা ঢাকতেই এমন মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয়েছে।

এদিকে স্ত্রীকে বাঁচাতে হাসপাতালে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সপরিবারে নির্যাতনের বিষয়ে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাইলে মেডিকেলের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।