মিয়ানমারে মক্কেলদের সঙ্গে ধরা হচ্ছে উকিলদেরও

মানুষজন নেই। ঘরবাড়িগুলো খা খা করছে। দোকানপাট বন্ধ। রাস্তাঘাটে চরে বেড়াচ্ছে কুকুর-শূকরের দল। শিক্ষক, নার্স ও চিকিৎসকদের পর এবার টার্গেট করা হচ্ছে আইনজীবীদের। রাজনৈতিক বন্দিদের আইনি সহায়তা দিলেই ধরে ধরে জেলে ভরা হচ্ছে। ফলে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন উকিল সমাজ।

মিয়ানমারের দক্ষিণের পাবর্ত্য অঞ্চল চীন রাজ্যের প্রত্যন্ত ও ছোট শহর মিনদাত। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে শহরটি এখন ভূতের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠী দমনে সামরিক জান্তার ধরপাকড় ও নিপীড়নের ভয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে জঙ্গলে পালিয়েছে বাসিন্দারা।

খাবার নেই, পানি নেই- জংলি শাকসবজি খেয়ে দিন পার করছেন হাজারো অসহায় মানুষ। বাইরে থেকে খাবার আনার পথও বন্ধ। শহরে প্রবেশের প্রধান সড়কে ব্যারিকেড বসিয়েছে। খাদ্যসামগ্রী ঢুকতে দিচ্ছে না। পানির লাইনও কেটে দিয়েছে।

রাজধানী নেপিদো কিংবা অন্য বড় শহরগুলোতেও ভালো নেই মানুষ। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ-প্রতিবাদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে জান্তা সরকার।

শিক্ষক, নার্স ও চিকিৎসকদের পর এবার টার্গেট করা হচ্ছে আইনজীবীদের। রাজনৈতিক বন্দিদের আইনি সহায়তা দিলেই ধরে ধরে জেলে ভরা হচ্ছে। ফলে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন উকিল সমাজ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মিয়ানমার নাউ জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে এখনো ছোটবড় বেশ কিছু শহর মার্শাল ’ল জারি রয়েছে।

এর মধ্যে চীন রাজ্যের মিনদাত অন্যতম। সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রতিরোধ বাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় আলোচনার পরও কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় গত ১২ মে শহরটিতে কঠোর কারফিউ জারি করা হয়।

এরপর প্রায় এক মাসের মধ্যে শহরটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার এখানে-ওখানে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করছে। তেমনি একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি মিয়ানমার নাউকে বলেন, ‘শহরে এই মুহূর্তে মানুষজন নেই বললেই চলে।

দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ ঘরবাড়ি ফেলেই পালিয়েছে। পোষা শূকরগুলো খাঁচার বেড়া ভেঙে বেরিয়ে গেছে।

রাস্তাঘাট এখন তাদের দখলে।’ প্রতিবেদন বলছে, জান্তার গ্রেফতার অভিযানের মুখে শহরের ১১ হাজার অধিবাসীর ৯০ শতাংশ পালিয়েছে। স্থানীয় সংগঠন মিনদাত পিপল’স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন টিমের তথ্য মতে, প্রায় ১০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় বা জঙ্গলে চলে গেছে। ফলে পুরো শহর এখন ভূতের শহরে পরিণত হয়েছে।

সোমবার আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছে। সেনা অভ্যুত্থানের পর গত প্রায় চার মাস ধরে বিরোধীদের ওপর অব্যাহতভাবে ধড়পাকড় চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির সামরিক জান্তা সরকার।

এরই অংশ হিসাবে এবার টার্গেট করা হচ্ছে আইনজীবীদের। বিক্ষোভ-আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আটক হওয়া মক্কেলদের আইনি সহায়তা দেওয়ায় আইনজীবীদেরও আটক করা হচ্ছে। গত মাসে মিয়ানমারজুড়ে অন্তত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত অং সান সু চির ঘনিষ্ট ও নেপিদো কাউন্সিল চেয়ারম্যান মিও অংয়ের আইনজীবী থেইন লাইং তুন।

গত মাসের শেষের দিকে তাকে আটক করা হয়। এই ধরপাকড়ের পর থেকে অনেক আইনজীবীই গা-ঢাকা দিয়েছেন। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটিতে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। আটক হন গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী ও প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির প্রধান অং সান সু চিসহ দলের অনেক শীর্ষ নেতাকে।

অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করে মিয়ানমারের লাখো গণতন্ত্রপন্থি, যা এখনো চলমান রয়েছে। এই আন্দোলনে সামরিক বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৮৮৩ জন নিহত হয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগে আটক, অভিযুক্ত ও সাজা দেওয়া হয়েছে আরও ছয় হাজারের বেশি মানুষকে।

এ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু এসব আমলে না নিয়ে আটক ও নির্যাতন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির সরকার।

অং সান সু চিকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই চালানো আইনজীবীদের নেতৃত্বে থাকা খিন মং ঝো গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা অন্য আইনজীবীদের (যারা এখনো আটক হননি) নিয়ে উদ্বিগ্ন।