বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে, তবুও তাদের দুর্দশা কেন?

বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ কিংবা মানুষ রয়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষে। জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিন প্রশ্নে যখনই কোনো প্রস্তাবের ওপর ভোট পড়েছে, তাতে বিশ্বের দেশগুলোর বিপুল ভোট পড়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষে।

তখনই যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়ে এসব প্রস্তাব অকার্যকর করে দিয়েছে; যে কারণে জাতিসঙ্ঘ ফিলিস্তিন সমস্যার কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না দশকের পর দশক ধরে। এ নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মনে একধরনের হতাশা এ মুহূর্তে থাকলেও তারা আশাবাদী, তাদের জনগণের শতাব্দী-প্রাচীন স্বাধীনতা সংগ্রাম একদিন সফল হবেই।

তাদের বিশ্বাস ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক বিভাজনের অবসান ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীনতার সূর্য এক দিন ছিনিয়ে আনবেই। কারণ বিশ্বজন গোষ্ঠীর অনুকূল সমর্থন রয়েছে ফিলিস্তিনিদের জন্য। একদিন ইসরাইল ও এর দোসর পরাশক্তিগুলো ফিলিস্তিনি জনগণ ও বিশ্ব জনমতের কাছের মাথা নত করবেই।

কিছু কিছু মহল মনে করে, ফিলিস্তিন ইস্যু আন্তর্জাতিক মহল থেকে হারিয়ে গেছে। তারা বলে, পিএলও বা ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ (পিএ) শুধু কথা ছাড়া আর কিছুই করছে না। সর্বশেষ পদক্ষেপে পশ্চিম তীরের ৩০ শতাংশ ভূখণ্ড ও জর্দান উপত্যকা ইসরাইলের সাথে একীভূত করার ব্যাপারে পিএলও ও পিএ কিছুই করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মহলও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসেনি ফিলিস্তিনের পক্ষে।

১৯৪৭-৪৮ সালের দিকে ইসরাইল যখন ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ অংশ দখল করে নেয়, তখনো আন্তর্জাতিক মহল এগিয়ে আসেনি ফিলিস্তিনের পক্ষে। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের সময় ইসরাইল দখল করে নিলো অবশিষ্ট ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। তখনো আন্তর্জাতিক মহল কিছুই করেনি। ২০১৮ সালে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে গিলে খেলো জেরুসালেম।

তখনো আন্তর্জাতিক মহল কিছুই করেনি ফিলিস্তিনের জন্য। একই সময়ে ইসরাইল গিলে খেলো সিরিয়ার গোলান মালভূমি। কী করল আন্তর্জাতিক মহল? কিছুই না। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার অনৈতিক ও অযৌক্তিকভাবে ফিলিস্তিনি ভূমি কার্যত তুলে দেয় জায়নবাদী আন্দোলনকারীদের হাতে। সেই থেকে পুরো ফিলিস্তিনকে গিলে খেতে ইসরাইল একটার একটা পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা তা বাধাগ্রস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবিত ‘টু-ন্যাশন থিওরি’ও ফিলিস্তিনিরা মেনে নিয়েছে শান্তির স্বার্থে। তা বাস্তবায়ন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মুখ ফিরিয়ে নেয়া ঠেকাতে পারেনি ফিলিস্তিনিরা। আন্তর্জাতিক মহলও নেয়নি কোনো পদক্ষেপ।

এসব উদাহরণ টেনে বলা হচ্ছে, ফিলিস্তিন ইস্যু শেষ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল বারবার যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে কিছু করতে না পারলেও এখনো বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ও মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে। এর একটি জায়মান উদাহরণ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য নির্বাচন। এ নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যু শেষ হয়ে যায়নি।

এ কথা সত্য, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কানাডার বিদেশনীতি তুলনামূলক ভালো। দীর্ঘ দিন থেকে কানাডা সম্পর্কে এমন একটি ধারণা বিশ্বমহলে বিদ্যমান। কিন্তু এটিও সত্য, জাতিসঙ্ঘের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় কানাডার নীতি-অবস্থান নিয়ে বিশ্ববাসীর মনে একধরনের বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এই নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে ইসরাইলের প্রতি কানাডার শর্তহীন অন্ধ সমর্থনের বিষয়টি নিয়ে। গত ১৭ জুন কানাডা দ্বিতীয়বারের মতো ব্যর্থ হলো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ লাভে। এ পদটি পেলে কানাডা বিশ্ব নেতৃত্বকারী দেশ হিসেবে অনেকটা এগিয়ে যেত। কিন্তু তা অর্জনে কানাডার যাবতীয় প্রয়াস আবারো ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নির্বাচনে কানাডার পক্ষে ভোট দিয়েছে ১০৮টি দেশ। অন্য দিকে নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড পেয়েছে যথাক্রমে ১৩০ ও ১২৮ দেশের ভোট। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড হবে নিরাপত্তা পরিষদের দুই নতুন সদস্য।

নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডের কাছে কানাডার এই ফেল মারার একটি বড় কারণ ইসরাইলের প্রতি কানাডার পক্ষপাতিত্ব। ফিলিস্তিনের ন্যায্য স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইনকানুন উপেক্ষা করে ইসরাইলের প্রতি কানাডার অন্ধ সমর্থনকে অনেক দেশই ভালো চোখে দেখেনি। কারণ কানাডা বিগত ২০ বছরে ফিলিস্তিনের অধিকারকে সমর্থন করে আনা জাতিসঙ্ঘের ১৬৬টি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। কানাডার এই পরাজয়ের ক্ষেত্রে এটিও একটি বড় বিবেচ্য। এমনটি মনে করেন কানাডিয়ান লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ইভিস এঙ্গলার।

এখানেই শেষ নয়, কানাডা অব্যাহতভাবে লবি করে চলেছে ফিলিস্তিনে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্ত অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত করতে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও আরো কয়েকটি দেশের সাথে মিলে কানাডা এ বিষয়ে আইসিসির বিচারিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এরা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে অভিযোগ তুলেছে, ফিলিস্তিন কোনো রাষ্ট্র নয়। অতএব ফিলিস্তিনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটন নিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আইসিসির বিচার করার কোনো ক্ষমতা নেই।

নিরাপত্তা পরিষেদের দুই নতুন সদস্য নির্বাচনের সামান্য কয়েক দিন আগে গত জুনে মানবাধিকার কর্মীদের একটি গোষ্ঠী জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলোর মাঝে একটি চিঠি বিতরণ করে। এ চিঠিতে তুলে ধরা হয় ফিলিস্তিন সম্পর্কে কানাডার ‘পুওর রেকর্ড’। চিঠিতে বলা হয় : ‘শান্তিবাদী হিসেবে কানাডার সুনাম থাকা সত্ত্বেও কানাডা আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি ‘বেনিভোলেন্ট প্লেয়ার’ হিসেবে কাজ করছে না।’ চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয় : ‘ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাস্টিন ট্রুডোর সরকার ফিলিস্তিনিদের অধিকারের সমর্থনে আনা জাতিসঙ্ঘের অর্ধ শতাধিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, যদিও বিস্ময়করভাবে এ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে বিপুল পরিমাণে।’ এ চিঠিতে স্বাক্ষকারীদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন বিশিষ্টব্যক্তিত্ব : নোয়াম চমস্কি, বিখ্যাত রক স্টার রজার ওয়াটার্স ও কুইবেকের সাবেক ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি মেম্বার আমির কাদির।

এর পরও জাতিসঙ্ঘে কানাডার রাষ্ট্রদূত মার্ক-অ্যান্ড্রি ব্ল্যাঙ্কার্ড ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব প্রশ্নে সাফাই গেয়ে কানাডার বিরুদ্ধে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ নির্বাচনের আগে জাতিসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ব্ল্যাঙ্কার্ড উল্লেখ করেন, এর আগে কানাডিয়ান একটি গোষ্ঠী ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে কানাডার দীর্ঘ দিনের অবস্থান সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য ভুল তথ্য দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রধানত ফিলিস্তিন প্রশ্নে কানাডার অবস্থানের কারণে দেশটি জাতিসঙ্ঘ সদস্য দেশগুলোর শ্রদ্ধা হারিয়েছে। এ বিষয়টি স্পষ্টতরভাবে ধরা পড়ে ইভিস এঙ্গলারের সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে। তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় কানাডিয়ান যিনি ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছেন।

সেই সাথে কানাডার ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেয়ার ব্যাপারে। এঙ্গলার বেশ কিছু বইও লিখেছেন, যার মধ্যে আছে : ‘কানাডা অ্যান্ড ইসরাইল : বিল্ডিং অ্যাপারথেড’ এবং ‘লেফট, রাইট : মার্চিং টু দ্য বিট অব ইম্পেরিয়াল কানাডা’। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘জনগণের গুরুত্ব অনুধাবন করা উচিত, কানাডা আজ ফিলিস্তিন-বিরোধী যে অবস্থান নিয়েছে, তা নতুন নয়। এ অবস্থান প্রোথিত রয়েছে এ দেশের শতাব্দী-প্রাচীন জায়নবাদী নীতিতে।’

গত জুনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা পরিষদের ভোট প্রসঙ্গে এঙ্গলার বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, একজন লিবারেল রাজনীতিবিদও বটে, প্রচুর শ্রম ব্যয় করেছেন এ নির্বাচনে কানাডাকে বিজয়ী করার জন্য। তিনি চালিয়েছেন ব্যাপক প্রচারাভিযান। দেখা করেছেন বিশ্বের এক ডজনের মতো বিশ্বনেতার সাথে, ব্যাপক লবি করেছেন কানাডার আসনটির পক্ষে। কিন্তু প্রথম রাউন্ডের ভোটে কানাডা বেশ ভালোভাবেই হেরে গেল আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের কাছে।’

তিনি আরো বলেন, আমার মসে হয়, কানাডার এই হেরে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে ফিলিস্তিন-বিরোধী রেকর্ড। অধিকতর সুনির্দিষ্টভাবে বললে, জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে কানাডার ভোট দেয়ার বিষয়টি। যেখানে গোটা পৃথিবী ভোট দিয়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, মাইক্রোনেশিয়া এবং হতে পারে আরো দুয়েকটি দেশের সাথে কানাডাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা দুনিয়া থেকে।’