বন্ধুর হাতে খুন হওয়ার মজাই (!) আলাদা

‘বন্ধুত্ব’ মানবজীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। যার ‘বন্ধু’ নাই, তার জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন। ‘পরিবার’ সবার জন্যই আপন, এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আপন ভুবন। এ আপন ভুবন বলেও আর কিছু থাকে না যখন মানুষ বন্ধুহারা হয়ে পড়ে।

নিজ পরিবারকে যা বলতে মানুষ সচ্ছন্দ বোধ করে না, বন্ধুকে সেটাও বলে অনায়াসে। বিপরীত লিঙ্গের সাথে বন্ধুত্ব একসময় পরিণত হয় ‘জীবন সাথী’ হিসেবে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতায় আত্মহত্যার অনেক ঘটনা রয়েছে, রয়েছে জীবনের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ছন্নছাড়া হয়ে পড়ার করুণ ইতিহাসও।

সম্রাট শাহজাহান মমতাজের বন্ধুত্ব তথা প্রেমের কারণে তাজমহল গড়েছেন। এর বিপরীতে গঙ্গায় সলিল সমাধির উদাহরণও কম নয়। বন্ধুর বিপদে বন্ধুর ঝাঁপিয়ে পড়া বা জীবন দেয়ার কাহিনীও রয়েছে অনেক। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘A friend is need, is a friend indeed’ বাংলায় বলে ‘বিপদেই বন্ধুর পরিচয়’। অন্য দিকে বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। বিশ্বাস করে যে বন্ধুকে ঘরে এনেছে, সে বন্ধুই তার স্ত্রীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়েছে, ধরা পড়লেই মামলা, মোকদ্দমা নতুবা খুন, এমন ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠীদের মধ্যেও অনেক সময় সামান্য মতবিরোধ (তা হোক রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত) হলেই খুনের পরিকল্পনা, এমনকি নিষ্ঠুরভাবে হত্যা। খুন করার পর পুলিশের চাপে বা অনুশোচনায় অনেক খুনিই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। সে জবানবন্দী পড়লে হতভম্ব হয়ে ভাবতে হয়, এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে কিভাবে এত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে পারে?
স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে।

দীর্ঘ দিন প্রেম করার পর একজন অন্যজনকে পুড়িয়ে হত্যা করছে এমন অনেক ঘটনা আছে। সম্প্রতি একজন পুলিশ সুপারকে (বাবুল) চট্টগ্রামে চাকরিরত অবস্থায় নিজ স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন। এ জন্য তাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ ওপর তলা থেকে নিচ তলা পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মানবজাতি ও সমাজ সরে এসেছে বলেই বিশ্বস্ততার পরিবর্তে বেঈমানির ইতিহাস অনেক বেশি। ফলে মানুষে মানুষে অবিশ্বাস বেড়েছে, খুন হত্যার সংখ্যা বেড়েছে।

পুলিশ জনগণের বন্ধু। অথচ পুলিশের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজি, অর্থ আদায়ের ব্যর্থতায় মাদক ব্যবসায়ী অপবাদ দিয়ে খুন করার অভিযোগ। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের যেভাবেই হোক, আইনের আওতায় আনা দরকার, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন করা প্রয়োজন, তাই বলে ক্রসফায়ার বা হত্যাই কি একমাত্র সমাধান? হত্যা করে যদি মাদক নির্মূল হতো, তবে একটা যুক্তি সরকার বা পুলিশ দেখাতে পারত। গণমানুষ মাদক কারবারি ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পতন চায়।

কিন্তু যেহেতু পুলিশেরই একটি অংশ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাদক কারবার করছে সেহেতু সাধারণ মানুষ এখন পুলিশকে আর আস্থায় আনতে পারছে না। দেশের জনগণ আছে উভয় সঙ্কটে। এক দিকে তারা মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ চায়, অন্য দিকে পুলিশকে বন্ধু হিসাবে নিতে পারছে না। পুলিশ নিজেদের কর্মদোষে জনগণের আস্থা হারিয়েছে।

‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ এ কথা পুলিশ কর্তৃপক্ষ জোর দিয়েই বলে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, জনগণ এ বন্ধুত্বে আস্থায় আনতে পারল না, ওটা স্লোগানে সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। পুলিশকে জনগণ কেন বন্ধু হিসেবে নিতে পারছে না, এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে গবেষণা করে দেখা হলো না। ভিন্ন ভিন্ন ‘প্রয়োজনের’ স্বাদ মেটাতে গিয়ে জনগণের চাহিদা থমকে গেছে। ১. জনগণের ‘প্রয়োজন’ জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা, ২. সরকারের ‘প্রয়োজন’ ক্ষমতায় টিকে থাকতে একটি লাঠিয়াল বাহিনী (যে বাহিনী খুন করলে বলা হবে এনকাউন্টার, আর মিথ্যা, ভুয়া কাল্পনিক মামলায়ও করা যাবে রিমান্ড বাণিজ্য) এবং ৩. পুলিশের ‘প্রয়োজন’ লোভনীয় পোস্টিং এবং জ্যেষ্ঠতা ডিঙ্গিয়ে পদোন্নতি। এই তিন ‘প্রয়োজনের’ চাহিদার মধ্যে সরকার ও পুলিশের ‘প্রয়োজন’ একে অপরের সম্পূরক হওয়ায় জনগণের ‘প্রয়োজন’ পেছনে পড়ে গেছে। ফলে ‘জনগণের’ পরিবর্তে ‘সরকার’ ও ‘পুলিশের’ বন্ধুত্বের রসায়ন এখন জমজমাট।

ভারত আমাদের বন্ধু। এক মন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারতের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক।’ বন্ধুত্বের গাঢ়তা ও দৃঢ়তা প্রমাণ করতে ক্ষমতাবান মন্ত্রী মহোদয় হয়তো এ বক্তব্য রেখেছেন। বন্ধু যাতে খুশি থাকে সে জন্যও বলে থাকতে পারেন। কিন্তু জনগণ বক্তব্যটি কতটুকু গ্রহণ করেছে অবশ্যই তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রতিনিয়তই সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশীদের খুন করে বন্ধুরা তাদের হাত রঞ্জিত করছে। একজন ব্যক্তি সীমান্ত অতিক্রম করলে পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রে কি গুলি করে হত্যা করা হয়? কোনো ব্যক্তি সীমান্ত অতিক্রম করলে তাকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় না এনে হত্যা করাই কি খাঁটি বন্ধুত্বের প্রমাণ?
গত ১৮-১৯ আগস্ট বন্ধুরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে এক বৈঠক করেন, গণমাধ্যমের ভাষায় যা ছিল একটি ‘শীতল বৈঠক’। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, ‘সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছি’। পক্ষান্তরে, বন্ধুরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন যে, ‘দুই দেশের সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় চলছে।’ অথচ এই সোনালি অধ্যায়ের মধ্যে বাংলাদেশের পানি সমস্যা, তিস্তা চুক্তি, দেশের বন্যা দীর্ঘ স্থায়ী হওয়ার সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনা বা প্রতিশ্রুতি নেই। ভারত জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়েছে, যার প্রতি বাংলাদেশের জোর সমর্থন ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বন্ধু ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি, বরং কৌশলগতভাবে নীরব থেকেছে।

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা ছিল, তৎসময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী না হয়ে অন্য কেউ হলে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিষয়টি ভারত কী পদ্ধতিতে হ্যান্ডেল বা কোন বিবেচনায় নিত, তা-ও পর্যালোচনার বিষয়। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাওয়া এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় ও যুদ্ধে সামরিক সাহায্যের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বাংলাদেশ ভারতের সব চাহিদাই পূরণ করেছে। বাংলাদেশকে তাদের পণ্যের বাজার বানিয়েছে। এখন এসেছে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে সরবরাহ করতে, যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি অর্থাৎ ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’। মিডিয়া কিন্তু বিষয়টি অন্য চোখে দেখছে। তাদের মতে চীনের প্রভাবকে খাটো করে ভারতের প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য বন্ধু পররাষ্ট্র সচিবের হঠাৎ করেই বাংলাদেশে আগমন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের বরাতে মিডিয়া বলেছে, পাশের রাষ্ট্রে ওসি প্রদীপের অনেক সম্পত্তির খোঁজ পেয়ে দুদক মামলা রুজু করেছে। ২০১৮ সালে তদন্ত শুরু করলেও এত দিন দুদক প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেনি। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং করে পি কে হালদার হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুধাংশু ভদ্র করোনা পজিটিভ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি তোলেন। এত শক্তি পি কে হালদার ও সুধাংশুরা পান কোথায়? প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছেন, তার পরও দেশের প্রচলিত আইন তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ বন্ধুরাষ্ট্রে মুসলমানরা কোন অবস্থায় রয়েছেন? এনআরসির নামে ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খুন করা হচ্ছে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন জার্মানির সংবাদমাধ্যমকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মোদি সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন হচ্ছে।
এ ছাড়া এখন সরকারের সমালোচনা করলে হয়রানি ও জেলে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।’

সীমান্তে (বর্ডার) বাংলাদেশী হত্যার বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব উদ্বেগ জানিয়েছেন, জোর প্রতিবাদ করতে পারেননি, বলতে পারেননি কেন সীমান্ত অতিক্রম করলে হত্যা করা হবে? প্রতিবারই শুনি সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু হত্যা বন্ধের জোরালো দাবি বাংলাদেশ করতে পারে না কেন? একটি প্রবাদ রয়েছে যে, ‘মুলা চুরি করলে ফাঁসি হয় না।’ কিন্তু ভারত-বাংলা সীমান্তে বিনা বিচারে হত্যা হয়, যার জন্য বাংলাদেশ শুধু উদ্বেগই জানায়, জোর প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করতে পারে না। নিজ দেশের আইনে অপরাধীন বিচার করার দাবি তুলতে পারে না। অন্য দিকে বাংলাদেশও রয়েছে নানাবিধ শোষণের মুখে। তবু ভারতের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক বলে দাবি করা হয়। ফলে বলতেই হবে যে, বন্ধুর হাতে খুন হওয়ার মজাই (!) আলাদা।