ফেঁ’সে যাচ্ছেন ইলিয়াস কোবরা : ব্যাংক হিসাব স্থগিত

কক্সবাজারের পু’লিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন, টেকনাফ থা’নার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্ম’কর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার, বাহারছড়া পু’লিশের ত’দন্ত কেন্দ্রের সাবেক ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী ও ইলিয়াস কোবরা সহ ৮ জনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ তথা স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানাগেছে, টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করাটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় মেজর সিনহার জন্য। প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্র অনুযায়ী, ক্রসফা’য়ারের নামে নৃশং’সভাবে খু’ন করা অ’সংখ্য মানুষের র’ক্তে রঞ্জিত প্রদীপ কুমারও ভিডিও সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বারবারই কেঁপে ওঠেন।

মেজর সিনহার তথ্যবহুল প্রশ্নের পর প্রশ্নে চরম অস্বস্তিতে পড়েন প্রদীপ। নানা অজুহাতে ভিডিও সাক্ষাৎকার এড়ানোর সব কৌশল খাটিয়েও ব্য’র্থ ওসি প্রদীপ বা’ধ্য হয়েই প্রশ্নবাণে জ’র্জরিত হতে থাকেন, ভিডিওচিত্রে মেজরের উ’দঘাটন করা নানা তথ্যের সামনে সীমাহীন নাস্তানাবুদ হন তিনি।

ক্রসফা’য়ারে অতিমাত্রায় উৎসাহী ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগীরা ইয়াবা বাজারজাত এবং পা’চারের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকার কথা স্বীকার করতে বা’ধ্য হন। সফল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেই মেজর সিনহা আর একদ- সময় ক্ষেপণ করেননি। ঝড়ের বেগে থা’না থেকে বেরিয়ে এসে নিজের গাড়িতে উঠে বসেন।

তার সঙ্গে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত থাকা সাহেদুল ই’সলাম সিফাতও ক্যামেরা, ট্রাইপড, ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠতেই টেকনাফ সদর ছেড়ে গাড়িটি ছুটতে থাকে উত্তর দিকে, বাহারছড়ার পথে। বাহারছড়া-সংলগ্ন মারিসঘোনা এলাকাতেই বসবাস করেন চলচ্চিত্রের ফা’ইটিং গ্রুপ পরিচালনাকারী ইলিয়াস কোবরা।

হঠাৎ তার টেলিফোনে করা আমন্ত্রণ পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেননি মেজর সিনহা মোহা’ম্মদ রাশেদ খান। এদিকে থা’না থেকে মেজর সিনহা বেরিয়ে যেতেই ওসি প্রদীপ অচিরেই বড় রকমের বি’পদের আশঙ্কায় তৎক্ষণাৎ কক্সবাজারের এসপি মাসুদকে ফোন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেন।

সব শুনে এসপি নিজেও উ’দ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কয়েক মিনিটেই এসপির নি’র্দেশনায় তৈরি হয় মেজর সিনহার নৃ’শংস হ’ত্যার নিন্ডিদ্র পরিকল্পনা। আলাপ-আলোচনা শেষে এসপি-ওসি এমনভাবেই ত্রিমুখী মা’র্ডার মিশন সাজিয়েছিলেন- সেই ফাঁ’দ থেকে মেজর সিনহা মোহা’ম্মদ রাশেদ খানের প্রা’ণে বাঁ’চার কোনো সুযোগই ছিল না।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রের ফা’ইটিং গ্রুপের পরিচালক ইলিয়াস কোবরাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, আতিথেয়তার নামে নানা কৌশলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেজর সিনহাকে তার নিভৃত পাহাড়ি গ্রামে আ’টকে রাখার। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পরিচিতি থাকলেও ইলিয়াস কোবরা ইদানীং ‘ক্রসফা’য়ার মিটমীমাং’সার দালালি’ কাজেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

ক্রসফা’য়ারের তালিকায় নাম থাকার গু’জব ছ’ড়িয়ে অ’সংখ্য মানুষকে গো’পনে ওসি প্রদীপের সঙ্গে সমঝোতা করিয়ে দিয়ে টেকনাফের শীর্ষ দালাল হিসেবে বেশ নামডাক ছ’ড়িয়ে পড়েছে কোবরার। তবে ক্রসফা’য়ারের কবল থেকে জী’বন বাঁ’চানোর সমঝোতায় ওসি প্রদীপ হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত।

অন্যদিকে দালালির কমিশন হিসেবে ইলিয়াস কোবরাকেও মাথাপিছু এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাইয়ে দিয়েছেন প্রদীপ। ওসিসহ পু’লিশ প্রশা’সনের কাছে পরীক্ষিত দালাল ইলিয়াস কোবরা ঠিকই তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। মারিসঘোনায় নিজের বাগানবাড়ী ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানোর নামে ইলিয়াস কোবরা সেদিন বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্জন পাহাড়েই নিজ হেফাজতে রেখেছিলেন মেজর সিনহাকে।

এ সময়ের মধ্যে মেজরের অবস্থান, কতক্ষণ পর কোন রাস্তায় কোথায় যাবেন সেসব তথ্য জানিয়ে কোবরা ৯টি এসএমএস পাঠান ওসিকে। পরিকল্পনামাফিক সন্ধ্যা ৭টার দিকে টেকনাফ থা’নার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ তার পছন্দের দুই এসআই ও দুই কনস্টেবল নিয়ে নিজের সাদা নোহায় এবং আরও পাঁচ-সাতজন পু’লিশ সদস্য অপর একটি মাইক্রোবাসে হন্তদন্ত অবস্থায় থা’না থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে ধরে উত্তর দিকে ছুটতে থাকেন।

ওসি বা’হিনী বাহারছড়া-কক্সবাজারের পথে শামলাপুর পু’লিশ ক্যাম্পে যাওয়ার পথেই ইলিয়াস কোবরার নতুন খবর আসে। ওসি প্রদীপকে ফোন করে তিনি জানান, এ মুহূর্তে মেজর সিনহা ও তার ভিডিওম্যান সিফাত মারিসঘোনার পাহাড়চূড়ায় উঠছেন। পাহাড়ের ওপর থেকে মেরিন ড্রাইভওয়ে, টেকনাফ সদর, নাফ নদী-মিয়ানমার সী’মান্ত এবং দক্ষিণ দিকে সমুদ্রের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়।

গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ছোট-বড় ইঞ্জিনবোটগুলো সার্চলাইটের আলো ফেলে ফেলে সমুদ্রসৈকতের দিকে আসতে থাকে, আবার ডজন ডজন ইঞ্জিনবোট সৈকত ছেড়ে গভীর সমুদ্রের দিকে যেতে থাকে। পুরো দৃশ্যপটের ভিডিওচিত্র ধারণ করাটাই হচ্ছে তার ডকুমেন্টারির শে’ষ দৃশ্য।

ইলিয়াস কোবরা ফোনে প্রদীপকে জানান, মেজর সাহেব পাহাড় থেকে নেমে কিছু সময়ের জন্য মেরিন ড্রাইভওয়ে ব্যবহার করে টেকনাফের দিকে যেতে পারেন, তারপর সেখান থেকে ফিরে যাবেন হিমছড়ির রিসোর্টে। এটুকু শুনেই ওসি প্রদীপ তার গাড়ি থামিয়ে দেন বাহারছড়া পৌঁছানোর আগেই।

মারিসঘোনা থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে তিন কিলোমিটার দূরের বড়ডিল নামক স্থানে ওসি ও তার সঙ্গীদের সবাই দুটি মাইক্রো থামিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতিতে অপেক্ষমাণ থাকেন। এর মধ্যেই ওসি প্রদীপ কুমার মারিসঘোনা এলাকার দুজন সোর্স ছাড়াও ক্রসফা’য়ার বাণিজ্যের টাকা সংগ্রহকারী এ’জেন্ট বলে কথিত আবদুল গফুর মেম্বার, হা’জী ইস’লাম, মুফতি কেফায়েতউল্লাহ ও হায়দার আলীকে ফোন করে জানান, মারিসঘোনা পাহাড়ের চূড়ায় বেশ কয়েকজন ভ’য়ঙ্কর স’ন্ত্রাসী বিপুল পরিমাণ অ’স্ত্রশ’স্ত্র নিয়ে জ’ড়ো হয়েছে।

তারা কেউ পাহাড় থেকে নামার চে’ষ্টা করলেই যেন এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ‘ডা’কাত, ডা’কাত’ চিৎ’কার জুড়ে দেওয়া হয় এবং যাদের হাতেনাতে পাওয়া যাবে তাদেরই যেন গ’ণপি’টুনি দিয়ে মে’রে ফেলা হয়। বাকি সবকিছু ওসি দেখবেন এবং এ জন্য তিনি মারিসঘোনার দিকে রওনা দিয়েছেন বলেও জানানো হয় তাদের।

ওসির কাছ থেকে পাওয়া এমন খবর ওসির এজেন্টরা পাহাড়-সংলগ্ন চারপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে ছ’ড়িয়ে দিয়ে লাঠিসোঁটায় সজ্জিত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু চৌকস সেনা অফিসার সিনহা পাহাড়ের চূড়ায় থাকাবস্থায়ই চারপাশে সাজ সাজ রব দেখে স’তর্ক হয়ে ওঠেন এবং এ কারণেই টর্চলাইট না জ্বালিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই ধীর লয়ে পাহাড় থেকে নিচে নেমে আসেন।

ঠিক তখনই বেশ কিছুসংখ্যক গ্রামবাসী ‘ডা’কাত, ডা’কাত’ চিৎ’কার জুড়ে দিয়ে তাদের চারপাশ থেকে ধাওয়া দিতে থাকে। কিন্তু মেজর সিনহা তার সহযোগীর হাত চে’পে ধ’রে প্রশিক্ষণের দ’ক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা পেরিয়ে পাকা সড়কে পৌঁছে যান এবং দ্রুত নিজের গাড়িতে উঠেই উত্তর দিকে হিমছড়ির দিকে রওনা হন।

বাহারছড়ার মারিসঘোনা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরেই শামলাপুরের সেই পু’লিশ চে’কপোস্ট। ওসির নি’র্দেশে যেখানে এসআই লিয়াকতসহ একদল পু’লিশ আরও আগে থেকেই ওতপেতে ছিল, সেখানেই পৌঁছে যায় মেজর সিনহার গাড়িটি। গাড়িটির খুব কাছে অ’স্ত্র তাক করে মেজরকে হাত তুলে সামনের দিকে মুখ করে আসার নি’র্দেশ দেন লিয়াকত।

আর গাড়ি থেকে নামতেই অব্য’র্থ নিশানায় লিয়াকত পর পর চারটি বু’লেট বি’দ্ধ করেন মেজর সিনহার দেহে। ফলে লুটিয়ে পড়েন মেজর। এদিকে বড়ডিল এলাকায় অপেক্ষমাণ ওসি বা’হিনী মেজরের উত্তর দিকে রওনা দেওয়ার খবর শুনেই শামলাপুর ক্যাম্পের দিকে রওনা দেয়, যে কারণে লিয়াকতের গু’লিতে মেজর মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ১৫-১৬ মিনিটের মধ্যেই ওসি বা’হিনী সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

কারণ টেকনাফ থা’না থেকে শামলাপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত যেতে প্রাইভেটকারে ৪০-৪৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু তিনি মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরের বড়ডিল এলাকায় থাকায় ১৫-১৬ মিনিটেই চেকপোস্টে পৌঁছেই মেজর সিনহার লুটিয়ে পড়া দেহ পা দিয়ে চেপে ধ’রে নিজের আগ্নেয়া’স্ত্র থেকে পর পর দুটি গু’লি বর্ষণ করে লাথি মেরে নিথর দেহখানা রাস্তার ধারে ফেলে দেন ওসি প্রদীপ।

ত্রিমুখী হ’ত্যা মিশনের ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একদিকে মারিসঘোনা গ্রামে ওসি প্রদীপের নিজস্ব এজেন্টদের দ্বারা ‘ডা’কাত, ডা’কাত’ চিৎ’কার জুড়ে গ’ণপি’টুনি দিয়ে হ’ত্যার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেখান থেকে জী’বন বাঁ’চিয়ে মেজর সিনহা যদি টেকনাফের দিকে রওনা হতেন, তাহলে তিন কিলোমিটার সামনে বড়ডিলে পৌঁছেই তিনি ওসি বা’হিনীর নি’র্বিচার গু’লিতে বেঘোরে জীবন হা’রাতেন।

অন্যদিকে মেজর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হিমছড়ি রিসোর্টের দিকে রওনা দিলেও শামলাপুরে তার জী’বন কে’ড়ে নিতে এসআই লিয়াকতের টিমকেও পূর্ণ প্রস্তুতিতে রাখা হয়। আসলে কোনো বিকল্প উপায় অবলম্বন করেই যেন মেজর সিনহা প্রা’ণ নিয়ে ফিরতে না পারেন তা শতভাগ নিশ্চিত করেই পাকা পরিকল্পনা আঁটেন এসপি মাসুদ। ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে তা বাস্তবায়িত হয়েছে অ’ব্যর্থভাবেই।

এদিকে আগামী ৩০ দিনের জন্য ব্যাংকগুলোকে এ নি’র্দেশনা পরিপালন করতে বলা হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থে‌কে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে এ নি’র্দেশনা দেয়া হয়। বিএফআইইউ সূত্র বিষয়‌টি নি‌শ্চিত ক‌রে‌ছে।

একইসঙ্গে চিঠি ইস্যু করার দিন থেকে তিনদিনের মধ্যে স্থগিত করা হিসাবগুলোর নাম, নম্বর, স্থিতি এ সংক্রান্ত তথ্যাদি (হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসি প্রোফাইল ফরম, হালনাগাদ লেনদেনের বিবরণী) পাঠাতে বলা হয়েছে।

চিঠিতে যে ৮ জনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত ও তথ্য চাওয়া হয়েছে, তারা হলেন- এ বি এম মাসুদ হোসেন, প্রদীপ কুমার দাশ, চুমকী কারান, প্রতীম কুমার দাশ, প্রতুশ কুমার দাশ, মো. লিয়াকত আলী, দিলীপ ও ইলিয়াস কোবরা।

হিসাবগুলোকে লেনদেন মানি লন্ডারিং প্রতিরো’ধ আ’ইনের ক্ষ’মতাবলে ৩০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নি’র্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া চিঠিতে প্রত্যেকের নামের পাশে জ’ন্ম তারিখ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে।