পুকুর ও খাল পুনঃখনন তালিকা নয়ছয়ে গচ্চা ৪২৩ কোটি টাকা

বরেন্দ্র এলাকার আট জেলা বাদে দেশের ৫৬ জেলায় পুকুর ও খাল পুনঃখনন করতে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, ব্যবহারের উপযোগী করার পাশাপাশি পুকুর-খালের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির মজুদ বাড়ানো ও শুকনো মৌসুমে পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। তবে পুকুর-খালের বৈষম্যমূলক তালিকা করায় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে তালিকা করতে হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি)।

যদিও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সব জেলার জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে তালিকা চেয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই কিছু জেলার বেশি পুকুর ও খাল তালিকায় ঢোকাতে হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সারা বছর পুকুরে পানি ধরে রেখে তা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার, মত্স্য চাষ, হাঁস পালন ও শাক-সবজি উৎপাদন করে বেকারত্ব দূর করাও এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এক হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পুকুর ও খাল পুনঃখনন প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় তিন বছর আগে। কিন্তু প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার আগে কোনো সমীক্ষা না করায় এর অগ্রগতি হতাশাজনক। তিন বছরে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার খাল ও ছয় একর পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে না পারায় এখন প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে ৪২৩ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ত পানি বেড়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির জন্য প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হয় দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মানুষকে। খাওয়া ও রান্নাবান্নার কাজের জন্য পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয় তাদের।

পুকুরে বর্ষা মৌসুমের পানি ধরে রেখে কোনোমতে মাসপাঁচেক চলে। খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও আশাশুনিতে সুপেয় পানির সংকটে গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতির চিত্র উঠে এসেছে আইসিডিডিআরবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে।

অথচ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই তিনটি জেলায় সরকারি পুকুর পুনঃখনন জরুরি হলেও বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পটুয়াখালী, ভোলা ও বরিশালের অনেক বেশি পুকুরের নাম ঢোকানো হয়েছে।

তৎকালীন সচিবের প্রভাবে পটুয়াখালীতে সর্বোচ্চ ৮৮৫টি পুকুর পুনঃখননের জন্য নাম ঢুকানো হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা  নিশ্চিত করেছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭৬টি পুকুরের নাম ঢুকেছে ভোলা থেকে। এই প্রকল্পের পরিচালক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের বাড়ি ভোলায়। তিনি নিজেই জানিয়েছেন এই তথ্য। তৃতীয় সর্বোচ্চ (৪১৮টি) পুকুরের নাম ঢুকানো হয়েছে বরিশালে বর্তমান এক সচিবের প্রভাবে।

এর বিপরীতে খুলনা থেকে মাত্র ৯০টি পুকুর তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়রা উপজেলার সাতটি ও দাকোপের সাতটি। সাতক্ষীরার ১১১টি পুকুরের মধ্যে শ্যামনগরের ১৫টি এবং আশাশুনির ১৬টি। উপকূলীয় আরেক জেলা লক্ষ্মীপুরের মাত্র ১৪টি পুকুর তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের অবস্থা আরো ভয়াবহ; ঠাকুরগাঁওয়ে ৯টি, নীলফামারীতে মাত্র একটি পুকুর রয়েছে তালিকায়। পার্বত্যাঞ্চলের অবস্থাও একই রকম।

এই প্রকল্পে নিজেদের চাহিদামতো খাল ও পুকুর তালিকাভুক্ত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র রফিকুল আলম ও যশোর বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম। তাঁরা  বলেন, তাঁদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী হয়নি। যাঁদের প্রভাব আছে, তাঁদের এলাকার পুকুর ও খাল প্রকল্পে ঢুকেছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘৫৬ জেলার জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার সবাইকে চিঠি দিয়েছি, তাদের এলাকার সরকারি পুকুর ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুরের নাম দেওয়ার জন্য। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও নাম পাওয়া যায়নি।’

এই প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন নিয়েও সমানভাবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আছে। ভোলা থেকে তালিকাভুক্ত হয়েছে ১৮১টি খাল, পটুয়াখালী থেকে ১৪২টি ও বরিশাল থেকে ৪১৮টি খাল। অন্যদিকে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় এ সংখ্যা দশের নিচে।

প্রকল্প পরিচালক নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় যান না বলেও অভিযোগ আছে। সম্প্রতি এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালককে নিয়মিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের তাগিদ দেন।

এই প্রকল্পে পুকুর থেকে কাটা মাটি কোথায় রাখা হবে তা নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা আনতে রিয়েল টাইম ডাটা ট্রান্সমিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শুধু খাস খাল ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর খনন করা হবে, ব্যক্তিগত পুকুর নয়।