পিকে হালদারের নেতৃত্বে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ২৫০০ কোটি টাকা লুট

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে ২৫০০ কোটি টাকা লুটে নেয়া হয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন পথে বসেছে।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার (পিকে হালদার) হালদারের নেতৃত্বে টাকাগুলো লুট করা হয়। এর মূল চাবিকাঠি নাড়েন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের তখনকার ডিএমডি রাশেদুল হক; যিনি পরে প্রতিষ্ঠানটির এমডিও হন।

মঙ্গলবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে ডেকে রাশেদুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

দুদক সূত্রে জানা যায়, রাশেদুল হক মূলত পিকে হালদারকে লুটে সাহায্য করেছেন। তিনি পিকে হালদারের ডানহাত ছিলেন। ২০১০ সালে পিকে হালদার যখন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি ছিলেন তখন রাশেদুল হক রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ডিএমডি ছিলেন। পিকে হালদার যখন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হন তখন রাশেদুল হক ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হিসেবে ২০১৫ সালে যোগদান করেন।

এমডি হিসেবে যোগ দিয়েই সব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেন রাশেদুল। কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ প্রস্তাবের পরদিনই ঋণ দিয়ে দেন। এভাবে প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ২৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো মর্টগেজ ছিল না। কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে মর্টগেজ ছাড়াই শত শত কোটি টাকা ঋণ দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংকে পথে বসিয়েছেন রাশেদুল।

রাশেদুল ছাড়াও মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. নুরুজ্জামানকে।

এছাড়া আরও দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে- তারা হলেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এভিপি আল মামুন সোহাগ ও সিনিয়র ম্যানেজার মো. রাফসান রিয়াদ চৌধুরী।

সূত্র জানায়, নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও নানাবিধ অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ হিসাবের অনুকূলে ঋণের নামে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপিটাল মার্কেটে সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

পিকে হালদারের বন্ধু মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক একেএম শহীদ রেজার স্বার্থসংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে ১০৪ কোটি টাকা এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সাতটি ঋণ হিসাব থেকে ৩৩টি চেকের মাধ্যমে ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডের স্টেশন রোড শাখার গ্রাহক ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইরফান আহমেদ খানের জেকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে পরিচালিত একটি হিসাবে ৭৪ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

পিকে হালদার এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৪টি ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দুটি স্থানের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। একটি হচ্ছে- ৫৬ পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা; আর অপরটি গ্রিনলাইন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের প্যাডে ২০১৭ সালের ১৩ জুন ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ওই ঋণের জন্য ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে মিলন কুমার আবেদন করেন। আবেদনপত্রে ঠিকানা উল্লেখ থাকলেও কোনো টেলিফোন নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্যাদি উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি লিমিটেড কোম্পানি হলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের সংঘস্মারক, ফরম-১১৭ সংরক্ষিত নেই।

ঋণ আবেদনের কয়েক দিনের মধ্যেই ঋণের সমুদয় অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে নেয়া হয়; যার সঙ্গে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।

দুদক জানায়, বেশিরভাগই ঋণের ক্ষেত্রে মর্টগেজ ছিল না, থাকলেও তার পরিমাণ খুবই নগন্য, কিছু ক্ষেত্রে মর্টগেজ নেয়ার কথা থাকলেও পরে মর্টগেজ নেয়া হয়নি। অথচ ঋণ হিসাব থেকে সব টাকা সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এজন্য ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের বোর্ড অব ডিরেক্টরস ও চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এজন্য তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

গত ২৩ আগস্ট যাদের দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তারা হলেন- ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান এমএ হাসেম, পরিচালক নাসিম আনোয়ার, পরিচালক বাসুদেব ব্যানার্জী, পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাশেম ও পরিচালক নওশেরুল ইসলাম।

এছাড়া গেল ২৪ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক মো. আনোয়ারুল কবির ও পরিচালক রাশেদুল হককে।