পাকিস্তান-সৌদি সম্পর্কে ফাটল : নেপথ্য সমীকরণ

ভূ-রাজনীতি একটা সদা-পরিবর্তনশীল বিষয়, এবং এই বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আসলে অন্য জায়গাতেও সেটা পরিবর্তন নিয়ে আসে, বিশেষ করে আন্ত-রাষ্ট্র সম্পর্কের উপর সেটার প্রভাব পড়ে, এবং একসময়ের মিত্র সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ এবং এমনকি শত্রুও হয়ে যেতে পারে বা এর উল্টাটাও হতে পারে।

সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টির বিষয়টি পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে পাকিস্তান আর সৌদি আরব উভয়েই পাশ্চাত্য থেকে নিয়ে প্রাচ্য পর্যন্ত বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ভারসাম্যে যে পরিবর্তন আসছে, সেটার ভিত্তিতেই আচরণ করছে, নিজেদের অবস্থানকে পুনসংজ্ঞায়িত করছে এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সাথে সম্পর্ককে ঢেলে সাজাচ্ছে।

সে কারণে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল বাজওয়া যদিও সম্পর্ক ‘পুনঃস্থাপনের’ দরকারি মিশনে সৌদি আরবে গেছেন, তবে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখানে অবশ্যম্ভাবীভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে চলেছে।

সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টির প্রধান কারণ যদিও মূলত ভারতের ইচ্ছেমতো কাশ্মীরকে সংযুক্তির সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সৌদি আরবের দায়সারা প্রতিক্রিয়া এবং সৌদি আরবের অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানের সমালোচনা, তবে এর পেছনে আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো সাদা চোখে নজরে পড়বে না।

এটা বোঝার জন্য আমাদের অবশ্যই প্রথমে যে প্রশ্নটি করতে হবে, সেটা হলো সৌদি আরব কেন পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে না, যেটা যে কোন ‘ভ্রাতৃপ্রতীম’ দেশ করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে এ অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতের সাথে সৌদি আরবের নিজস্ব পরিবর্তিত সম্পর্কের মধ্যে। সৌদি আরব (এবং তার মিত্র দেশগুলো) ভারতে বহু বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করছে এবং কাশ্মীরে মোদি সরকারের বর্বরতা বা ভারতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান সত্বেও তাদের এ অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি।

এর থেকেই বোঝা যায় যে, পাকিস্তান ওআইসির প্রতি বারবার যে দাবি জানাচ্ছে এবং মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করে কাশ্মীরের ব্যাপারে যৌথ নীতি গ্রহণের দাবি জানিয়েছে, সেই দাবির ব্যাপারে সৌদি আরব কেন এত বিরক্ত।

সৌদির দায়সারা জবাবের ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া থেকেও একইভাবে বোঝা গেছে যে, পাকিস্তান তাদের ভূ-রাজনৈতিক নীতিকে ঢেলে সাজাচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সৌদি আরবকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং তাদেরকে ‘সাথে নিয়ে বা বাদ দিয়েই’ সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন, তখন তিনি মূলত কূটনৈতিক সমর্থনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, পাকিস্তান যেটা তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ইরানের মতো অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর কাছ থেকে পেয়েছে।

এমনকি, কোরেশি এই ডাকও দিয়েছেন যে, “কাশ্মীর ইস্যুতে যারা পাকিস্তানের পাশে থাকবে, এবং নির্যাতিত কাশ্মীরীদের সমর্থন দেয়ার জন্য যারা এগিয়ে আসবে, সেই ইসলামিক দেশগুলোকে নিয়ে বৈঠক করা হবে”।

সৌদি আরবের তিক্ত প্রতিপক্ষ ইরান এবং ভারতের সাথেও ইরানের সম্পর্ক আর আগের মতো আন্তরিক নয়, কারণ মোদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার সামনে শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। এ কারণে যে ইরান কাশ্মীর ইস্যুতে কূটনৈতিকভাবে নীরব ছিল, তারা এখন কথা বলেছে এবং এই ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছে।

ইরানের এই অবস্থানের আরেকটি কারণ হলো চীনের সাথে তাদের কৌশলগত সম্পর্কের দ্রুত বিবর্তন, এবং তাদের এই প্রত্যাশাও রয়েছে যে, ‘চীন ফ্যাক্টর’ পাক-ইরান সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলবে।

পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত বারবার একটা ‘গোল্ডেন রিং’ সৃষ্টির কথা বলেছেন, ইরানের চাবাহার বন্দরের সাথে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরকে যুক্ত করে যে রিং সৃষ্টি করা হবে।

এই গোল্ডেন রিং ধারণার মধ্যে রাশিয়াও একটি পক্ষ হিসেবে থাকবে। ফলে এখানে একটা নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ সৃষ্টি হচ্ছে, যেখানে দুটো পরাশক্তি রয়েছে। এভাবে এই রিংটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বদলে দেবে।

পাকিস্তানের তাই শক্তিশালী কারণ রয়েছে এবং সে জন্য তারা পররাষ্ট্রনীতিকে সৌদি প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনছে।

এমনকি, সৌদি আরব যখন তাদের অর্থ ফেরত চেয়েছে, পাকিস্তান তখন চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। এতে বোঝা গেছে যে, পাকিস্তান কিভাবে নিজেদেরকে ‘গোল্ডেন রিংয়ের’ কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।

চীনের নেতৃত্বাধীন এই জোটটি শুধু বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং তারা কাশ্মীরের ব্যাপারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

৫ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে চীন যে বার্তা দিয়েছে, সেটা যথেষ্ট শক্তিশালী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখমাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেছেন :

“কাশ্মীর অঞ্চলের পরিস্থিতির উপর চীন ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। কাশ্মীর ইস্যুতে আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। প্রথমত, কাশ্মীর একটি বিতর্কিত ইস্যু, যে বিতর্কটা ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে চলে আসছে, যেটার বাস্তবতা জাতিসঙ্ঞ সনদ, সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং পাকিস্তান ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত।

“দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর অঞ্চলের স্থিতিশীলতা পরিবর্তনে যে কোন একতরফা পদক্ষেপ অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা ও বিনিময়ের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে যথাযথভাবে কাশ্মীর ইস্যুটির সমাধান হওয়া উচিত”।

‘মুসলিম উম্মাহ’র প্রশ্নে পাকিস্তান স্বেচ্ছায় ইরান, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর সাথে যে বলয়ে যোগ দিয়েছে, সৌদি আরবের মূলত স্ব-ঘোষিত উম্মাহের নেতৃত্বের উপর তার প্রভাব পড়বে, যেখানে মক্কা-ভিত্তিক ওআইসিকে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে বিরোধী কোন সংস্থা যদি দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে সেটা মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় জায়গাটাকে নাড়িয়ে দেবে।

তবে মুসলিম বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ‘নেতৃত্বের’ জায়গা থেকে সৌদি আরব এরই মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিচ্যুত হয়ে গেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এরই মধ্যে নেতৃত্ব গ্রহণের চেষ্টা শুরু করেছে। সেই অনুসারে এই দেশটি সম্প্রতি ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছে, এবং এর প্রেক্ষিতে ইসরাইল ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরকে মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা থেকে বিরত হয়েছে।

এই ঘটনা একটা শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে: সংযুক্ত আরব আমিরাত হলো পুরো মুসলিম বিশ্বের একমাত্র দেশ, ইসরাইলের হাত থেকে ফিলিস্তিনের রক্ষা করার সামর্থ যাদের রয়েছে।

ধর্মীয় বিষয় ছাড়া সৌদি আরবের সাথে বহু পুরনো ‘ভ্রাতৃত্বের’ সম্পর্কে আটকে থাকার জন্য এখন আর জোরালো কোন কারণ নেই পাকিস্তানের। কারণ এই সম্পর্ক পাকিস্তানের স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে গেছে, বিশেষ করে কাশ্মীর নিয়ে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এই সম্পর্ক।

সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর