পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের নেপথ্যে

রাজধানীর পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে যুবলীগ নেতাদের আধিপত্য বিস্তারের জের। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একই দলের প্রতিপক্ষ নেতাকে ফাঁসানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পুলিশকে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে থানার অভ্যন্তরে বোমা বিস্ফোরণের এ তথ্য।

পোশাক কারখানার চাঁদাবাজির একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য পল্লবী থানা যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে হত্যা পরিকল্পনার নাটক সাজাতে গিয়েই থানার ভেতরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। আর এ ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জড়িত বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

এ দিকে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। কেননা তদন্ত করতে গিয়ে আসল অপরাধীর পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও জড়িত বলে প্রমাণ মিলছে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে।

এ অবস্থায় পল্লবী থানা পুলিশের কাছ থেকে মামলার তদন্তভার ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পল্লবী থানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনার ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহম্মেদ, পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো: মিজানুর রহমান ও সহকারী পুলিশ কমিশনার মো: ফিরোজ কাওছারকে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া পল্লবী থানার একাধিক কর্মকর্তাকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

ডিএমপির জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মো: ওয়ালিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলার পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। ওই কমিটির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বোঝা যাবে বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার সম্পর্ক ছিল কি না।

সূত্র জানায়, মিরপুর বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে স্থানীয়র এক কাউন্সিলর একাধিকবার সভা করেন পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঊর্ধ্বতন ওই পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশনায় পল্লবী থানা ও রূপনগর থানা পুলিশের সহায়তায় জুয়েল রানার তিন অনুসারী রফিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও মোকারোফ হোসেনকে আলাদা আলাদা জায়গা থেকে আটক করে।

পরবর্তী সময়ে বৃহস্পতিবার রাতে আটক হওয়া এ তিন ব্যক্তিকে পুলিশের গাড়িতে তুলে কালশী কবরস্থানের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই গাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ওয়েট মেশিন নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর, তার সহযোগী হিরন ও আলমগীর।

এ সময় তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি ও ওয়েট মেশিনের ব্যাগ পুলিশের হাতে আটক হওয়া তিন ব্যক্তির কাছে জোর করে দেয়া হয়। তার পর রাতে থানায় নিয়ে অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে মর্মে সিজার লিস্ট তৈরি করতে থাকেন থানার একজন এসআই। এরই মধ্যে সিটিটিসির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে ওই বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করার জন্য ডাকা হয়।

কিন্তু তারা বালু ও মাটি দেখে ফিরে যান। সকালের দিকে সিজার লিস্ট প্রস্তুতকারী এসআই বালু-মাটিভর্তি ওয়েট মেশিন মনে করে মেশিনটি ফ্লোরে ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে চার পুলিশ কর্মকর্তাসহ পাঁচজন আহত হন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে একজনের চোখ নষ্ট হওয়ার পথে। আরেকজনের হাত কেটে ফেলতে হবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। সূত্র মতে, বালু-মাটিভর্তি ওয়েট মেশিনের ভেতরে মধ্য রাতে ককটেল ঢুকানো হয়েছে; যা শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তাই জানতেন।

সূত্র মতে, বিস্ফোরণ ঘটনার আগে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানার ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তার মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে জুয়েল রানার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও চুরির অভিযোগ তুলে পল্লবী থানায় একটি মামলা করেন ট্রাফিক সার্জেন্ট মো: আল ফরহাদ মোল্লা। মামলার অভিযোগে বলা হয়, যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে মাস্ক পরতে বলায় তিনি ট্রাফিক সার্জেন্টের ওপর হামলা চালান এবং শরীরে সংযুক্ত ক্যামেরা কেড়ে নেন। জুয়েল নিজের পকেট থেকে পিস্তল বের করেও সার্জেন্টের দিকে তেড়ে আসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জুয়েলকে হত্যার টার্গেটের পেছনে এ ঘটনাটিও সাজিয়েছিল এক পুলিশ কর্মকর্তা। বিনিময়ে কাউন্সিলরের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা গ্রহণের চুক্তি হয়েছিল। অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক জুয়েল রানার অনুসারীদের কাছ থেকে উদ্ধার দেখিয়ে মামলার পর আসামিদের নিয়ে জুয়েল রানাকে ধরার টার্গেট ছিল। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সিজার লিস্ট তৈরিকারী এসআইয়ের অজ্ঞতাবশত থানার ভেতরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

মিরপুরের একাধিক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী জানান, পল্লবী থানা পুলিশ জুয়েল রানার অনুসারী যে তিন ব্যক্তি রফিকুল, শহিদুল ও মোকারোফকে ধরেছে তারা অন্তত এ বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। এমনকি জুয়েল রানাকে ভিকটিম বানানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, পল্লবী থানা পুলিশের হাতে আটক হওয়া তিনজনকে বিস্ফোরণ ঘটনার অনেক আগেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রথমে কয়েক দিন রূপনগর থানায় রাখা হয়। পরে পল্লবী থানা পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয়।

এরপর কালশী কবরস্থানে নিয়ে তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরকভর্তি ওয়েট মেশিন জোর করে দেয়া হয়। কালশী কবরস্থানের আশপাশে তখন লাইট জ্বলছিল, সিসিটিভি ফুটেজেও বিষয়টি ধরা পড়েছে।

অস্ত্র ও গুলি ঠিকমতো সরবরাহ করা হলেও ওয়েট মেশিনের ভেতরে বিস্ফোরকের বদলে ছিল বালু ও মাটি। ফলে বিস্ফোরক পরীক্ষার জন্য সিটিটিসির বম্ব টিমকে ডেকে পাঠানো হলেও তারা বালু ও মাটি দেখে ফিরে যান।