দুর্নীতি বন্ধে আরও কঠোর হতে হবে: রাশেদ খান মেনন

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছেন, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং লুটপাট সরকারের অর্জন নষ্ট করে দিচ্ছে। চুনোপুঁটি ধরে লাভ নেই। ধরতে হবে রাঘববোয়ালদের।

মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরগুলোতে জেঁকে বসা দুর্নীতি বন্ধে আরও কঠোর হতে হবে। এসব জায়গায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটগুলো ভাঙতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষ না বাঁচলে, সরকার থাকে না।

সম্প্রতি দেয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। ডাকসুর সাবেক ভিপি, ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন দেশের বামপন্থী শীর্ষ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। মন্ত্রীও ছিলেন। এখন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

করোনাভাইরাস, বন্যা, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে তিনি যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন।

রাশেদ খান মেনন বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা, মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের মতানৈক্যসহ সামগ্রিক ভঙ্গুর চিত্র ফুটে উঠছে।

এর সঙ্গে দুর্নীতি ও লুটপাটের ভয়াবহ ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। এসব দেখে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য খাতের ওপর আস্থা আরও কমে গেছে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনা মোকাবেলায় নিজে নিজের মন্ত্রণালয়কে সফলতার নম্বর দিয়ে যাচ্ছেন।

বাস্তবে দেশে করোনাভাইরাস দেখা দেয়ার পর থেকে তার মন্ত্রণালয়েই একের পর এক দুর্নীতি আর লুটপাটের ভয়াবহ চিত্রই প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি বলেন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর একজন আরেকজনকে দোষারোপ করেছে। একজন আরেকজনকে দায়ী করেছে। এটি জনগণকে হতাশ করেছে।

যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই করোনা মোকাবেলায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় হাতে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।

কিন্তু তাকে সহায়তা করার মতো অন্যরা তেমনভাবে এগিয়ে আসেননি। যে কারণে একদিকে যেমন মৃত্যুহার বেড়েছে। অন্যদিকে ঝুঁকিও বেড়েছে। একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, মানুষের জীবনই যদি না থাকে, তাহলে সরকার থাকে না।

রাশেদ খান মেনন বলেন, করোনা আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। এখন অযথা বিতর্ক না করে দ্রুত এই খাতকে পুনর্গঠন করা উচিত।

এই খাতে যারা লুটেরা ও বড় বড় দুর্নীতিবাজ তাদের চিহ্নিত করা উচিত। স্বাস্থ্য খাতে যে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কথা বলা হচ্ছে, তা ভেঙে দেয়া উচিত।

একজন মো. সাহেদ কিংবা একজন ডা. সাবরিনাকে গ্রেফতার করলে বা আইনের আওতায় নিলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, তারা চুনোপুঁটি। রাঘববোয়ালরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

তাদেরকেও আইনের আওতায় নিতে হবে। তা না হলে স্বাস্থ্য খাতে লুটপাট অব্যাহত থাকবে। মানুষের আস্থা ফিরে আসবে না। প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, করোনাভাইরাসের সময় স্বাস্থ্য খাতে উপসর্গগুলো প্রকাশিত হয়েছে।

এখন উপসর্গগুলো দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, অন্যান্য খাতেও যেভাবে একের পর এক দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র প্রকাশিত হচ্ছে, তা বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

তিনি বলেন, প্রথম থেকেই আমরা ‘করোনা নাশে মানুষের পাশে’ শীর্ষক স্লোগানকে সামনে রেখে করোনা মোকাবেলায় দলীয় উদ্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াই। আমাদের এই উদ্যোগ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

যদিও করোনাভাইরাস দেখা দেয়ার পর থেকেই রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে দূরে রেখে দুর্যোগ মোকাবেলা করার চেষ্টা হয়েছে, যা ছিল আত্মঘাতী। এ দেশে সবকিছু মোকাবেলায় এখন আমলানির্ভর হয়ে গেছে। এটি ভালো লক্ষণ নয়।

সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, রাজনীতি, রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের বাদ দিয়ে সংকট মোকাবেলা করা যায় না। অতীতেও যায়নি।

বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই রাজনৈতিক দল এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা হয়েছে। এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। সবকিছু আমলানির্ভর, যা আত্মঘাতী ফল বয়ে আনবে।

রাশেদ খান মেনন বলেন, করোনায় অর্থনীতির চাকা অচল ছিল। এই সময়ে বেকারত্ব বেড়েছে। কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। উৎপাদন থেমে গেছে। পরিস্থিতি ইতোমধ্যে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

এর মধ্যেই আবার আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। মানুষই অর্থনীতির হাল ধরবে। মানুষই অর্থনীতি বাঁচাবে। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিবিদদের।

স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। করোনা যে শিক্ষা দিয়ে গেছে। তা থেকে শিখতে হবে। নতুন করে বাঁচতে চাইলে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে যেতে হবে। সমাজের যেসব অসঙ্গতি প্রকাশিত হয়েছে তা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।