চীনে কেন যুক্তরাষ্ট্র বোমা মারবে না?

কোল্ড ওয়ারের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা একালে এখানে আবার বয়ান করতে নিশ্চয় বসিনি। তা হলে? অন্তত ছয় মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উঠতে বসতে চীন-ব্যাশিং বা চীনকে গুঁতা দেয়া একবারে চরমে নিয়ে গেছেন।

এ ছাড়া ট্রাম্পের পুরো চার বছর (২০১৭-২০) চীন বিরোধিতার বাণিজ্যযুদ্ধ সারা সময়ই কমবেশি ছিল। এমনকি এ বছরের শুধু চীন-আমেরিকার আপসী বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ভাগও দু’পক্ষ স্বাক্ষর করে রেখেছে।

কিন্তু আর কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্প করবেন না নির্বাচন পর্যন্ত। কারণ তার বিশ্বাস একমাত্র চরম ও কড়া চীনা ব্যাশিং করলেই তিনি ভোটে হেরে যাওয়ার অবস্থার মুখে, একমাত্র সম্ভাবনা হিসেবে পরিস্থিতি নিজের দিকে ঘোরাতে পারেন।

সে যাই হোক, নির্বাচনে জয়-পরাজয় তো একটা হবেই। কিন্তু এর আগের যে ভাষ্যটা ক্রমেই প্রবল হচ্ছে সেটা হলো, কোল্ড ওয়ার আবার নাকি ফিরে আসছে। যেহেতু ফিরে আসা তাই তারা আগবাড়িয়ে চীন-আমেরিকার মধ্যকার এবারের হবু টেনশন-সঙ্ঘাতকে কোল্ড ওয়ার ২.০ বলা শুরু করে দিয়েছেন।

এখানে আমার প্রথম মন্তব্য হলো, আমাদের পরিচিত একমাত্র দুনিয়াটাতে আবার নতুন করে কখনো কোথাও কারো সাথে কারো আর কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক তৈরি হবে না, তা দেখা যাবে না। কাজেই যারাই কোল্ড ওয়ারের কথা আবার তুলছেন, তারা সময় ও পরিবেশ মিলিয়ে যাচাই করে না দেখেই মুখস্থের মতো এসব কথা বলছেন।

তাদের উচিত হবে, কেন সোভিয়েত-আমেরিকা একটা কোল্ড ওয়ার সম্পর্কে জড়াতে পেরেছিল, তার পেছনের অবজেকটিভ বা বাস্তব শর্ত কী ছিল আগে তা খুঁজে দেখা।

কথাটা সরাসরি বললে, সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য বিনিময় ছিল না। এটাই হলো সবচেয়ে নির্ধারক বাস্তবতা। এ কারণে কোল্ড ওয়ারের মতো চরম বিরোধাত্মক সম্পর্কে যাওয়ার বাস্তব শর্ত সেকালে তৈরী ছিল, যা এখন আর নেই।

আর কখনো ফিরেও আসবে না। এর বিপরীতে আজকের পুতিনের রাশিয়া আর ভেঙে তৈরি হওয়া ১৫টি রাষ্ট্রসহ সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য। মানে একই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সদস্য। আগে এক রাষ্ট্র অপরের রাজধানীতে বোমা ফেলে আসার কথা অবলীলায় ভাবা তখন সম্ভব ছিল।

কারণ পরস্পরের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলেই অপরের মাথায় বোমা মারা সম্ভব ছিল। আজ আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট চীনের বাজারে বিনিয়োগ করে ছেয়ে আছে। তাই চীনের মাথায় বোমা মারতে হলে এর আগে অনেক কিছু ভাবতে হবে।

কারণ আজ সেটা নিজ দেশের বা স্বার্থের প্রতিষ্ঠানের ওপরই বোমা মারা হয়ে যেতে পারে। কাজেই আজকের সম্পর্ক নতুন করে অন্য কিছু একটা হলেও হতে পারে; কিন্তু পুরনো কোল্ড ওয়ার আর হবে না।

দুনিয়াতে কোল্ড ওয়ার ফিরবে না। এখন চাল-ডাল মিশে যাওয়ার মতো একবার তা মিশিয়ে দিলে যেমন তা আবার আলাদা করা কঠিন, সে রকম আমরা সবাই গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে চলে গেছি বলে চাইলেই অনেক কিছু করা যাবে না।

এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলছেন, তিনি সম্পর্ক ভালো করতে চীনের দিকে আগাবেন না। কিন্তু নির্বাচনের পরে ট্রাম্পই জিতে গেলে অথবা যেই জিতুক, আবার চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক হওয়া খুবই সম্ভব। এই যে আগে-পিছে করার সুযোগ নিতে পারি এখন, এটা পুরনো কোল্ড ওয়ারের আমলে সম্ভবই ছিল না।