চীনের বিরুদ্ধে অচলাবস্থা : বেকায়দায় ভারত!

হিমালয়ের লাদাখে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যদের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা ১৫তম সপ্তাহে উপনীত হলেও আলোচনা বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সামান্যই। এতে করে নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে।

ভারতের অতিরিক্ত সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে অসন্তুষ্ট হয়ে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের একটি গ্রুপ বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার জন্য মোদি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

দীর্ঘ দিনের অচলাবস্থার কারণে স্থিতিবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভারতের সামরিক বিকল্পগুলো আরো হ্রাস পেতে পারে মনে করে তারা কলকাতায় চীনা কনস্যুলেট বন্ধ করে দেয়া, আন্তর্জাতিক মহলের শরণাপন্ন হওয়াসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য নয়া দিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

নয়া দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক ব্রহ্ম চেলানি ভারতের মাটিতে চীনা কনস্যুলেট ও দূতাবাসের আকার ছোট করা বা বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র টেক্সাসে চীনা মিশন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন চেঙ্গদুতে আমেরিকান মিশন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।

চীন ও ভঅরতীয় সৈন্যদের মধ্যে ১৫ জুনের সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য মারা যায়। উত্তেজনা প্রশমন করার জন্য দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা অন্তত ১১বার বৈঠক করেছেন।

এদিকে নয়া দিল্লি সড়ক অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষিদ্ধ করা, বিদ্যুৎ খাতে চীনা সরঞ্জাম আমদানি সীমিত করার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনপ্রিয় টিকটকসহ ৫৯টি চনিা অ্যাপসও নিষিদ্ধ করেছে ভারত জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে।

তবে বেইজিং হলো নয়া দিল্লির আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস। গত বছর ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে ওষুধসহ নানা পণ্য চীন থেকে আমদানি করেছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের। ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলো চীন। দেশটির সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের।

সাবেক সামরিক কর্মকর্তা প্রবীন সোহনি, তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ম্যাগাজিন ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, বলেন, চীন এখন সব কার্ড হাতে রেখেছে। সরকার যেসব অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেগুলো চীনের চেয়ে ভারতকে বেশি কষ্টে ফেলবে।

এখন পর্যন্ত মোদি তার বক্তৃতায় চীনের নাম বলেননি। তার সরকার গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রথমবারের মতো চীনা সৈন্যদের অনুপ্রবেশের কথা বলেছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়েবসাইটে আপ করা নথিগুলো সরিয়ে নেয়া হয়।

গত ১৯ জুন ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনা সৈন্যদের অনুপ্রবেশ অস্বীকার করেন মোদি। তবে বিশ্লেষকেরা, এবং এমনকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বলেছে, আগে বিরোধপূর্ণ বিবেচিত না হওয়া গালওয়ান উপত্যকায় চীনা সৈন্যরা একটি অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করার ওই সংঘর্ষ হয়েছিল।

সোহনি বলেন, ওই দিন চীনারা জয়ী হয়েছিল। আপনার প্রধানমন্ত্রী যখন বলছেন যে কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি, তার মানে হলো খেলা শেষ।
চেলানি বলেন, দেশে দৃঢ় নেতার ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে যে কাজটি করেছেন তা চীনের জন্য খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে।

চীনের হাতে সব কার্ড
চীন ও ভারতের মধ্যে সিনিয়র সামরিক কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মে মাসের প্রথম দিক থেকে ভারতীয় ও চীনা সৈন্যরা দুই দেশের মধ্যে থাকা ৩,৪৮৮ কিলোমিটার লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের (এলএসি) বিভিন্ন স্থানে মুখোমুখি হয়। গালওয়ান ছাড়া অন্য কোনো স্থানে সৈন্যদের প্রত্যাহার করা হয়নি বলে সামরিক সূত্র জানিয়েছে। এ ব্যাপারে ভারতের সামরিক বাহিনী মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

অচলাবস্থা সত্ত্বেও আলোচনার কারণে মোদি সরকার দেশে ফায়দা হাসিল করেছেন। সংবাদ চ্যানেলগুলো প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করছে, এলএসিতে চীনা সৈন্যদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার জন্য মোদিকে স্যালুট করছে, এবং চীন কিভাবে মোদির নেতৃত্বে গঠিত নয়া ভারতের চাপের মুখে প্রত্যাহার করছে, তা বলছে।

কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল এইচ এস পানাগ, তিনি ২০০৮ সাল পর্যন্ত চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন দুই দশক ধরে, বলেন যে দৃঢ়তার অভাবে এই আশঙ্কা জোরদার হয়েছে যে চীনা অনুপ্রবেশে ভারত ইতোমধ্যেই বিপুল পরিমাণে জমি হারিয়েছে।
তিনি বলেন, চীনারা তাদের দখল করা এলাকা থেকে সরে না যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সোহনি এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছ থেকে সহযোগিতা গ্রহণের কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমাদের কেবল রাশিয়াই সহায়তা করতে পারে। তিনি বলেন, ইউরেশিয়ায় ভারসাম্য রক্ষার মতো শক্তি আছে রাশিয়ার এবং সে চীন ও ভারতের সাথে কথা বলতে চায়। আমরা শিগগিরই রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিদেশীয় ফোরামকে সক্রিয় দেখতে চাই। তিনি বলেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে কোনো লাভ হবে না।

সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের চেলানিও এর সাথে একমত। তিনি বলেন, চীনকে সংযত রাখার ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এবং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত কোয়াড সামুদ্রিক সহযোগিতার ওপর জোর দেয়।

তিনি বলেন, কিন্তু ভারত এখন চীনা স্থল আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। আর চীনের সাথে স্থল যুদ্ধে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উষ্ণ হলেও ভারতীয় নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সহযোগিতার ঊর্ধ্বে ওঠতে পারবে না।