গ্রিসকে ধ্বংসের হুমকি দিলেন এরদোয়ান

বিরোধপূর্ণ পূর্ব ভূমধ্যসাগর নিয়ে এবার গ্রিসের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসিপ তাইপ এরদোয়ান বলেছেন, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজের অধিকার কখনো ছেড়ে দেবে না আঙ্কারা। এক্ষেত্রে কোনোরকম ভুল না করার জন্য তিনি গ্রিসকে সতর্ক করেন।

হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘নিজেদের ধ্বংসের পথ বেছে নেবেন না।’

বুধবার (২৬ আগস্ট) সেলজুক তুর্কিদের বায়জান্টাইন সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মালাজগার্ট বিজয়ের এগারো শতবর্ষপূর্তি’র অনুষ্ঠানে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।

বাইজেন্টাইন বা বাইজান্টিয়াম হচ্ছে, মধ্যযুগীয় গ্রিকভাষী রোমানদের দ্বারা পরিচালিত সাম্রাজ্য। এ সম্রাজ্যে গ্রিকদের আধিপত্য বেশি থাকায় অনেকেই একে গ্রিকদের সাম্রাজ্য নামে অভিহিত করে থাকেন। সেলজুকরা মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত ওঘুজ গোত্রের।

ধর্মীয়ভাবে তারা সুন্নি মুসলমান। একাদশ শতাব্দীতে তারা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান কুয়েত ও ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরান প্রভৃতি অঞ্চল বিজয় করে। তাদের হাত ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে তুর্কি প্রভাব-বলয় শুরু হয় এবং পরবর্তীতে ওসমানী খেলাফত প্রতিষ্ঠা পায়। তাই গ্রিসের সঙ্গে তুরস্কের সংঘাত হাজার বছরের পুরনো ঘটনা।

 

বর্তমানে তুরস্কে ও গ্রিস পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে মারাত্মক দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। এজিয়ান সাগরের বেশ কয়েকটি দ্বীপ নিয়েও তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে ওই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধের জেরে একবার দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

এরদোয়ান বলেন, “আমাদের অধিকার নিয়ে আমরা আপস করব না। এজন্য যা করা দরকার আমরা তাই করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে সতর্ক হতে বলি যে, কোনো রকমের ভুল তাদের জন্য ধ্বংসের পথ তৈরি করে দেবে।”

গ্রিস বলেছে, তারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ফ্রান্স, ইতালি ও সাইপ্রাসের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করবে। গ্রিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সাইপ্রাসের দক্ষিণে এবং গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে তিনদিন ধরে এ মহড়া চলবে। এর আগে চলমান পরিস্থিতিতে গ্রিসের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার (২৬ আগস্ট) তুরস্ক বিরোধ পূর্ণ ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে পুরোপুরি যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।

সাইপ্রাস দক্ষিণে ও ক্রিট দ্বীপের আশপাশে গ্যাসের বিরাট মজুদ পেয়েছে তুরস্ক। এরপরই দুই দেশের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা চরমে উঠেছে। সাইপ্রাস ও গ্রিস দাবি করছে, গ্যাসের এ মজুদ তাদের সীমানায় রয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসিপ তাইপ এরদোয়ানের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইগিত বুলুত বলেন, গ্রিসের কোনো কর্মকর্তা এজিয়ান সাগরের বিরোধপূর্ণ ইমিয়া দ্বীপপুঞ্জে প্রবেশ করলেই তার হাত-পা ভেঙে দেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিটি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী নাকি কোনো সাধারণ কর্মকর্তা তা বিবেচনায় নেয়া হবে না।

আঙ্কারা সবসময়ই যুক্তি দিয়ে আসছে যে সাইপ্রাসের প্রাকৃতিক সম্পদ ভাগাভাগি করতে হবে। এর পর ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে তুরস্ক লিবিয়ার সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। তুরস্কের বলছে এর মাধ্যমে তারা তুরস্কের দক্ষিণ উপকুল থেকে লিবিয়ার উত্তর-পূর্ব তীর পর্যন্ত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে মিশর বলেছে, ‘এ উদ্যোগ অবৈধ।’ আর গ্রিস বলে, ‘এটা এক অবাস্তব উদ্যোগ কারণ এ দুটি দেশের মাঝখানে যে গ্রিসের একটি দ্বীপ ক্রিটের অবস্থান তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ’

এমন উত্তেজনাকে আরো একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে গ্রিস ও মিশরের মধ্যকার নতুন একটি চুক্তি। যেটির মাধ্যমে তারা তুরস্ককে এই অঞ্চলে হটানোর পরিকল্পনা করে।

কিন্তু মিশরের সরাসরি কোনো জল সীমা না থাকায় গ্রিসের সঙ্গে করা ওই চুক্তিকে অযৌক্তিক বলে ব্যাখ্যা করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। একই দাবি করেছে আঙ্কারাও। অন্যদিকে এই সঙ্ঘাতে গ্রিসের পাশে রয়েছে ফ্রান্স। গ্রিসের সমর্থনে বিরোধপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে দেশটি। তাৎক্ষণাত ফ্রান্সের ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এরদোয়ান।

এর আগে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু বলছেন, ‘গ্রিসের মূলভূমি থেকে অনেক দূরে যেসব দ্বীপ তারা নিজেদের বলে দাবি করছে সেগুলো তুরস্কের খুবই কাছে। তাই তারা তাদের চারপাশের অগভীর সমুদ্র এলাকাকে ‌কন্টিনেন্টাল শেলফ‌ অর্থাৎ তার নিজস্ব স্থলভাগের অংশ বলে দাবি করতে পারে না।’ তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট গত মাসে বলেছেন, ‘তুরস্কের মানুষকে তাদের মূলভূমিতে আটকে রাখতে যে মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে, আঙ্কারা তা ছিঁড়ে ফেলবে। জাতিসংঘের সমুদ্র সংক্রান্ত আইন মেনেই কাজ করছে তুরস্ক।’

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এ ব্যাপারে গ্রিসের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাজ এথেন্স সফরে গিয়ে তুরস্কের প্রতি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় উস্কানিমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন। ফরাসী প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ওই অঞ্চল ঘুরে এসে সাইপ্রাস ও গ্রিসের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।