গোর্খারা যেভাবে দুর্ধর্ষ সৈন্য হিসেবে পরিচিত হলো

নেপাল থেকে রিক্রুটমেন্ট শুরু হয় অ্যাঙ্গো নেপাল যুদ্ধের (১১৪-১৮১৬) পর। এ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের প্রতিপক্ষের সাহসিতকায় মুগ্ধ হয়ে যায়।

কয়েক দশক পর ভারতের ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ ঘোষণা করেন, ‘যদি কেউ বলে সে মরতে ভয় পায় না, তবে সে হয় মিথ্যা কথা বলছে, কিংবা সে গোর্খা।‘ ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর নেপাল, ব্রিটেন ও ভারত ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তিতে সই করে। এতে নেপালি নাগরিকদের এসব দেশের সেনাবাহিনীতে রিক্রুটের ব্যবস্থা হয়।

চুক্তি পরিবর্তনের আলোচনা

নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি নেপালের দায়দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয় ২০১৮ সালে। এসময় ব্রিটেন নিয়ম করে যে গোর্খা নারীদের তাদের দেশের অনুমতি ছাড়াই নিয়োগ করা যাবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নেপাল বিদেশী সেনাবাহিনীতে নেপালি নাগরিকদের নির্বাচন ও নিয়োগের মানসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

কাঠমান্ডু বিদ্যমান চুক্তিটি পর্যালোচনা করে এর বদলে প্রতিটি দেশের সাথে আলাদা আলাদা চুক্তি করতে আগ্রহী। কারণ বর্তমান চুক্তির ফলে নেপালের পক্ষে তার নাগরিকদের বিদেশী সেনাবাহিনীতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন সম্ভব হয় না। নেপালি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগে বলেছিলেন, আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নেপাল সরকারের ভূমিকা নির্ধারণ করব।

জুলাই মাসে অনলাইন সভায় তিনি বলেন,
এটি নেপালি তরুণদের জন্য বিদেশে যাওয়ার জানালা খুলে দেবে। অতীতে এই ব্যবস্থায় সমাজে অনেক চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে চুক্তির কিছু ধারা প্রশ্নবোধক। ফলে আমরা বিভিন্ন আপত্তিকর বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চাই।
অবশ্য, নেপালি প্রস্তাবের প্রতি ব্রিটেন ও ভারত তেমনভাবে সাড়া দিচ্ছে না।

নেপালের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, এমন অনেক দেশের বিরুদ্ধে সঙ্ঘর্ষে গোর্খাদের ব্যবহার করা হয়। চীন (১৯৬২ ও ১৯৬৭) ও পাকিস্তানের (১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯) সব যুদ্ধেই ভারত তার গোর্খা রেজিমেন্ট ব্যবহার করেছে। ১৯৪৭ সালের চুক্তিতে তা করা যায়। এ নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

গাওয়ালির বক্তব্যের পর  প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নেপাল নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত রঞ্জিত রাই সতর্কতার সাথে অগ্রসর হওয়ার জন্য কাঠমান্ডুকে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, রিক্রুটমেন্ট ও সেবা নিয়ে আলোচনা করা এক জিনিস, কিন্তু নেপালের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এমন দেশের বিরুদ্ধে সঙ্ঘর্ষের সময় নেপালি গোর্খাদের ব্যবহার করা যাবে না মর্মে দাবি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তিনি বলেন, এটা স্পষ্টভাবেই অগ্রহণযোগ্য হবে। ২০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য সমাপ্তি টানার ক্ষেত্রে নেপালকে সার্বিক বিষয়ে খুবই সতর্ক হতে হবে।

গোর্খাদের রিক্রুটমেন্ট প্রায়ই অর্থনৈতিকভাবে মুনাফামূলক হয়ে থাকে। তবে নেপালের জন্য গোর্খা রিক্রুটমেন্টে গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি হয় পুরোপুরি বর্ণভিত্তিক ব্যবস্থায়। নিয়োগ হয় প্রধানত পশ্চিম নেপালের পাহাড়ি মাগার ও গুরুং সম্প্রদায় এবং পূর্ব নেপালের কিরাতি নাই ও লিমবুস এলাকা থেকে।

এর ফলে এসব এলাকার লোকজন বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মূলধারা থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়ে থাকে। ঐতিহাসিকভাবে এর ফলে এসব এলাকার তরুণরা নিজেদের দেশের চেয়ে ব্রিটিশ বা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করাকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে নেপালের জনশক্তি অন্য দেশের জন্য কাজ করছে, এমনকি অন্য দেশের জন্যই মারা মারা যাচ্ছে।

তাছাড়া যোদ্ধা হিসেবে নেপালিদের প্রতিনিধিত্ব করা ও ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ফলে এসব দেশ নেপালের ওপর দাদাগিরি ফলাতে পারে। ব্রিটেন ও ভারতে নেপালকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও অর্থনৈতিকভাবে গরিব হিসেবে মনে করা হয়। ধারনা করা হয, নেপালের আয়ের উৎস কম বলেই নেপালিদেরকে তাদের সেনাবাহিনীতে রিক্রুট করা হয়।

ফলে নেপালের কাছে গোর্খা রিক্রুটমেন্ট আসলে উপনিবেশিক প্রকল্পের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়, তারা বিদেশী সেনাবাহিনীর জন্য মারা যায় বা হত্যা করে। এটি মানুষকে ভাড়াটে সৈন্য বা সহিংসতার মেশিনে পরিণত করে।

সূত্র : স্ক্রল.ইন