গালওয়ান সংঘর্ষ দুর্ভাগ্যজনক ও সংক্ষিপ্ত ঘটনা : চীনা রাষ্ট্রদূত

পূর্বলাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত-চীন সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে মুখ খুললেন ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সান ওয়েইডং। ওই সংঘর্ষে এক কর্নেলসহ ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যুর ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যায়িত করলেন তিনি। ভারত বা চীন কেউই এই ধরনের ঘটনা দেখতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গত ১৮ আগস্ট ভারত-চীন যুব ফোরামের ওয়েবিনারে এসব মন্তব্য করেছিলেন দিল্লিতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত। যদিও তার বিবৃতি গতকাল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সরকারিভাবে অনলাইনে আপলোড করা হয়।

ওয়েইডং’এর অভিমত, গালওয়ান সংঘর্ষের ঘটনা দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে তিক্ত করেছে তবে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় ছাড়া কিছুই নয়।

ওয়েবিনারের অনুষ্ঠান থেকে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন ‘খুব বেশি দিন আগের নয়, সম্প্রতি সীমান্তে একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে গিয়েছে। ভারত বা চীন কেউই এই ঘটনা দেখতে চায় না। এখন আমরা এটা মিটিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ইতিহাসের নিরিখে এটা একটা অতি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়।’

সান ওয়েইডং আরও জানান ‘৭০ বছর আগে ভারত ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সময় থেকেই দ্বিপাকিক্ষক সম্পর্ক নানা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে গেছে এবং আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। একটি ঘটনায় এই সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়ুক তা আমরা চাই না। এই নতুন শতাব্দীতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কখনও পেছনের দিকে হাঁটতে পারে না বরং আরও সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত।’

ভারত ও চীন দুইটি প্রাচীন সভ্যতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঠিকপথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো জ্ঞান ও ক্ষমতা উভয় দেশের আছে বলেও অভিমত চীনা রাষ্ট্রদূতের। তিনি বলেন ‘চীন কখনও ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না, বরং একজন সহযোগী দেশ হিসেবেই দেখে এবং হুমকির বদলে উভয়দেশের মধ্যে একটা বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। সীমান্ত সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যথাযথ স্থানে উত্থাপিত করে আলোচনা ও সংলাপের মধ্যে দ্রুত মিটিয়ে ফেলার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’

দ্বন্দ্ব এড়িয়ে ভারত ও চীন উভয় রাষ্ট্রেরই শান্তি বজায় রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। সান ওয়েইডং বলেন ‘কোনো দেশই বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না এবং একার পক্ষে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে পারে না। আমাদের কেবল স্বনির্ভর হওয়ার ওপরে জোর দিলেই হবে না। বিশ্বায়নের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাইরের দরজাও খোলা রাখতে হবে। আর একমাত্র এই পথেই আমরা আরও অধিকমাত্রায় উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি।’

ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ওপরও জোর দিয়েছেন সান ওয়েইডং। তিনি জানান ‘বহু বছর ধরেই ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। আবার দক্ষিণ এশিয়াতেও চীনের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলো ভারত। ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক পরস্পর নির্ভরশীল। আমি মনে করি যে, ভারত ও চীনের দুই বৃহৎ অর্থনীতি চুম্বকের মতো একে অপরকে আকর্ষণ করবে।’

গত ১৫ জুন পূর্বলাদাখের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে অন্তত পাঁচ দফায় সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পর্যায়ে দুই দেশের বৈঠক বসলেও কোনো সমাধান বেরিয়ে আসেনি। পারস্পরিক ঐকমত্যের জায়গায় এসেও চীন কথার খেলাপ করেছে বলে অভিযোগ।

এরই মধ্যে সীমান্ত বরাবর দুই দেশই তাদের সমরাস্ত্র সাজাচ্ছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, যা নিয়ে উভয়দেশের মধ্যেই উত্তেজনা বাড়ছে। এরই মধ্যে ভারতের চিফ অব আর্মি স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল বিপিন রাওয়াত সামরিকভাবে জবাব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এমন অবস্থায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কূটনৈতিক মহলের অভিমত, গালওয়ান সংঘর্ষ ও লাদাখে চীনা আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া তিক্ততা নিয়ে দিল্লির মন গলাতে চাইছে বেইজিং।