কাশ্মীর নিয়ে চীন ও পাকিস্তানের পদক্ষেপে দিশেহারা ভারত

এক বছর আগে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর, পাকিস্তানের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে একে ‘ভারতের অবৈধ দখল করা জম্মু ও কাশ্মীর’ হিসেবে বর্ণনা করায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে।

লাইন অব কন্ট্রোলে (এলওসি) উভয়পক্ষ গোলা বিনিময় করছে, আর কূটনৈতিক ফ্রন্টে চলছে কঠোর বাক্য বিনিময়।

ভারতের ওই পদক্ষেপের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে এক বক্তৃতায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আবারো দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে কাশ্মীরের জন্য পাকিস্তান তার দাবি জানানো অব্যাহত রাখবে।

এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কাশ্মীরীদের প্রতি সমর্থন দিতে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক পথ গ্রহণ অব্যাহত রাখবে। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট থেকে পাকিস্তান এই পদক্ষেপই গ্রহণ করেছে এবং তা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইমরান খানের কঠোর বক্তৃতা তা প্রবলভাবে ফুটে ওঠেছে।

ওই বক্তৃতার পর ভারতকে বেশ অসন্তুষ্ট করে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রত্যাশা মতো পাকিস্তান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।

এক বছরের মধ্যে এ ধরনের তিনটি বৈঠক হয় এবং এতে কয়েক দশক ধরে চলমান সমস্যাটির সমাধানের আশাবাদের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের প্রতি চীনা সমর্থন কেবল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধা কাটানোর মধ্যেই সীমিত ছিল না, বরং সেইসাথে ভারতের স্থিতিবস্থা পরিবর্তনকে অবৈধ ও অন্যায় বলে অভিহিত করে।

আর কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জোরদার করবে, যা ভারতের কাশ্মীর সমস্যা আরো প্রকট করে তুলবে। কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রতি চীনা সমর্থন ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পাওয়ার তিনটি কারণ রয়েছে।

লাদাখে চীনের ক্রোধ

ভারত কাশ্মীরের মর্যাদা পরিবর্তন করার পর থেকে দেশটির প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে চীন। গত বছর ভারত কেবল সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫ক বাতিলই করেনি, সেইসাথে একে দ্বিখণ্ডিত করে দুটি কেন্দ্রশাসিত ভূখণ্ডেও পরিণত করেছে।

লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত ভূখণ্ডে পরিণত করার পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বেইজিং। চীন জোর দিয়ে বলেছে যে ভারতের একতরফা পদক্ষেপের ফলে ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব নষ্ট হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য।

লাদাখের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় ভারতের একতরফাভাবে লাদাখের মর্যাদা পরিবর্তন ও চীনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ করার ঘটনায়। চীনের বিধিনিষেধ প্রতিক্রিয়া কেবল কড়া বিবৃতির মধ্যেই শেষ হয়নি।

বেইজিং তার লাদাখ সমস্যা মোকাবেলার জন্য দ্বিমুখী অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রথমত গত সেপ্টেম্বর থেকে এলএসিতে চাপ দিয়ে আসছে এবং দ্বিতীয়ত, চীনসহ পাকিস্তান ও ভারতকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে।

২০২০ সালের গ্রীষ্মে পূর্ব লাদাখে চীন ও ভারত মুখোমুখি হয়। আর মধ্য জুনে দুই দেশের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সৈন্য মারা যায়। এদের মধ্যে একজন কর্নেলও রয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে এখন এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

তবে বোঝা যাচ্ছে, লাদাখে চীন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে যাবে না।

এলওসিজুড়ে বেইজিংয়ের আগ্রহ

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের পদক্ষেপে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকা একটি বিষয় হলো এই যে পাকিস্তানের কাছ থেকে ভূখণ্ড কেড়ে নেয়া। শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের কাছ থেকে আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বাল্টিস্তান (জিবি) কেড়ে নেয়ার কথা বলছেন।

এটা অর্জন করা সহজ না হলেও এ ধরনের বক্তব্য এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতের ওই ইচ্ছা কখনো অবদমিত হয়নি। পাকিস্তান সুস্পষ্টভাবে বলে আসছে যে তারা ভারতের প্রতিক্রিয়ার সমুচিত জবাব দেবে। ভারতের প্রতিক্রিয়ায় আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বাল্টিস্তানে চীনের অবস্থান কেবল জোরদারই হচ্ছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো ফ্ল্যাগশিপ হিসেবে অভিহিত করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরকে (সিপিইসি) আরো জোরদার করা হচ্ছে নতুন নতুন চুক্তির মাধ্যমে। বেইজিং ও ইসলামাবাদ জলবিদ্যুতের জন্য ৩.৯ বিলিয়ন ডলারের দুটি চুক্তিতে সই করেছে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জলবিদ্যুতের উভয় প্রকল্পই আজাদ কাশ্মীরে অবস্থিত। এসব প্রকল্প সিপিইসির অংশ এবং উত্তপ্ত এলএসির খুব কাছে অবস্থিত। অঞ্চলটি কেবল চীন সীমান্তেই অবস্থিত নয়, এটি সিপিইসির প্রবেশদ্বারও। আর শক্তিশালী ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কারাকোরাম হাইওয়ে অতিক্রম করেছে গিলগিট-বাল্টিস্তান মহাসড়ক দিয়ে। বেইজিং ভারতের সর্বপশ্চিম এলাকার কাছ দিয়ে ফ্রেন্ডশিপ হাইওয়ে চালু করার কথাও ঘোষণা করেছে।

আজাদ কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রকল্প সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে চীনের ক্রাউন জুয়েল সিপিইসি সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। ফলে প্রকল্পটি রক্ষার জন্য পাকিস্তানকে সহায়তা করবে চীন, তা অবধারিত বিষয়।

বন্ধুত্বের ঘোষণা দেয়া

কাশ্মীরে সুস্পষ্ট ও সম্প্রসারণশীল অবস্থান ছাড়াও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জোরদার করার কথা জানিয়েছে চীন। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সমর্থনের সময় চীন তার বৃহত্তম কূটনৈতিক শোডাউন করেছে।

এতে পাকিস্তানের সাথে চীনের দৃঢ় বন্ধনের বিষয়টি প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে পাকিস্তান ও চীন একে অপরের প্রধান বিষয়গুলোর ব্যাপারে সচেতন। পাকিস্তান অব্যাহতভাবে উইঘুর মুসলিমদের অবস্থার ব্যাপারে কথা বলা এড়িয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তানের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে চীন।

অর্থাৎ কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে যাবে চীন। মনে রাখার বিষয় হলো, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাশ্মীর। কাশ্মীর ইস্যুতে যারা সমর্থন দিয়ে থাকে, পাকিস্তান সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

পাকিস্তান যখন কাশ্মীর নিয়ে ভারতের ভাষ্যকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে, তখন চীনের সুস্পষ্ট সমর্থন ন্যায়সঙ্গত।

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর