করোনা রিলিফ নিয়ে ট্রাম্পের উদাসীনতায় সংকটে ২ কোটি আমেরিকান

স্বামীর নির্যাতনে গৃহত্যাগে বাধ্য হওয়া শিশু সন্তানসহ এক বাঙালি মা করোনা মহামারির জন্যে নিউইয়র্ক সিটির আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই পেয়েছেন। গত সপ্তাহে তাকে বলা হয়েছে কাজ খুঁজে নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে যাবার জন্য। আরেক বাঙালি মা দেলোয়ারা বেগমের ছেলে কাজ করতেন স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে যাতায়াতকারি ফেরীতে। সেটি বন্ধের নোটিশ দেয়া হয়েছে অর্থাৎ সেখানে যারা কাজ করতেন সকলেই বেকার হয়ে পড়বেন।

জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কস এবং ব্রুকলীনের বেশক’টি রেস্টুরেন্টে ব্যবসা ( ভেতরে বসে খাবারের অনুমতি নেই) একেবারেই কমে যাওয়ায় কর্মচারি ছাঁটাই করা হয়েছে। এরা সকলেই বাংলাদেশি। এধরনের ভয়ংকর একটি পরিস্থিতি সমগ্র আমেরিকায় বিরাজ করছে।

২৩ আগস্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিগগিরই ২০ মিলিয়ন তথা দুই কোটি আমেরিকানের পরিবারের সদস্যরা নিদারুন কষ্টে নিপতিত হবে। বাসা ভাড়া বকেয়ার জন্য এরা উচ্ছেদের ভিকটিম হবে। করোনা মহামারির পর লকডাউনে থাকা কর্মহীন আমেরিকানরা সপ্তাহে ৬০০ ডলার করে পেয়েছেন। তা দিয়ে দিন কাটছিল কোনমতে। তবে অনেকে বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে সক্ষম হননি।

জুলাইয়ের ৩১ তারিখে সেই বেকার ভাতার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। এখনও বেকার রয়েছেন ৩ কোটি আমেরিকান অর্থাৎ এরা খাদ্য সংগ্রহেই সক্ষম হচ্ছেন না, বাসা ভাড়া দেবেন কোত্থেকে। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ডেমক্র্যাটরা ‘হিরোজ এ্যাক্ট’ বিল পাশ করেছেন ১৫ মে।

কিন্তু রিপাবলিকান শাসিত ইউএস সিনেটে সেটি গুরুত্ব পায়নি। এরফলে বাসা ভাড়া মওকুফের যে কথা উঠেছিল সেটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমনকি সাপ্তাহিক বেকার ভাতাও আগস্ট থেকে বন্ধ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেকার ভাতা ৪০০ ডলার করে প্রদানের বিশেষ একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন ৮ আগস্টে। স্টেটসমূহ সেটি বাস্তবায়িত করতে পারেনি নিজেরাই অর্থ সংকটে থাকায়।

উল্লেখ্য, ডেমক্র্যাটদের পাশ করা বিলে এককালিন ১২০০ ডলার করে মাথাপিছু প্রদানের কথা। সেটিও ঝুলে রয়েছে রিপাবলিকানদের অসহযোগিতায়।

তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মিলিয়ন তথা এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ বর্তমানে দারিদ্রসীমার নীচে জীবন-যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় করোনা রিলিফ হিসেবে পুনরায় যদি বেকার ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাদি চালু করা না হয় তাহলে কঠিন এক সংকটে পড়বে গোটা আমেরিকা। ইতিপূর্বের মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে আসন্ন অবস্থা-এমন আশংকা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. জ্যাচ পেরলিন।

তিনি বলেন, কমপক্ষে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি বিতরণ করতে হবে বেকার হয়ে থাকা মানুষের মধ্যে।

প্রসঙ্গত, চার সদস্যের একটি পরিবারের বার্ষিক আয় যদি ২৬ হাজার ২০০ ডলারের কম হয় তাহলে সেই পরিবারকে দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ এ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিস এই ক্যাটাগরি নির্ধারণ করেছে।  সংবাদ তৈরী করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সেনসাস ব্যুরোর তথ্য থেকে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সাপ্তাহিক ৬০০ ডলারের বেকার ভাতা বন্ধ হবার পর ২৯ মিলিয়ন আমেরিকান প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে।

সেন্টার ফর বাজেট এ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটির তথ্য অনুযায়ী ১৫ মিলিয়ন অর্থাৎ দেড় কোটি ভাড়াটে গত এপ্রিল থেকে বাসা ভাড়া প্রদানে সক্ষম হননি। দারিদ্র এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে গবেষনারত শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ব্রুস মায়ার বলেছেন, করোনা স্টিমুলাস প্যাকেজ বাস্তবায়িত না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে গরিবের চেয়েও গরিব মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মহামারির শুরুতে করোনা রিলিফ বিল পাশে যে মনোভাব ছিল, তা পুনরায় জাগ্রত করা সম্ভব না হলে বিরাট একটি জনগোষ্ঠী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নাজুক অবস্থায় পতিত হবে। যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

নিউইয়র্কে দক্ষিণ এশিয়ানদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে কর্মরত ‘সাউথ এশিয়ান ফান্ড ফর এডুকেশন, স্কলারশিপ এ্যান্ড ট্রেনিং’ তথা স্যাফেস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক মাজেদা এ উদ্দিন রবিবার রাতে বলেন, বেকার নারী-পুরুষের অধিকাংশই সিটিজেন নন। এজন্যে তারা ফুডস্ট্যাম্প (পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণে সরকারী ভর্তুকি) এর আবেদন করেও মঞ্জুরি পাননি।

মাজেদা উল্লেখ করেন, নিউইয়র্কে বসবাসরতদের মধ্যে যারা রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, খুচরা স্টোর অথবা অন্যকোন পেশায় ছিলেন, তার সিংহভাগেরই গ্রীণকার্ড/ওয়ার্ক পারমিট নেই। ফলে করোনায় বন্দিজীবনে তারা সরকারের কোন সহায়তাই পাননি। বর্তমানে দোকান-রেস্টুরেন্ট খুললেও মালিকেরা তাদেরকেই ছাঁটাই করছেন। অর্থাৎ নিদারুণ এক কষ্টে পতিত হবেন এ শ্রেণীর অভিবাসীরা। যাদের গ্রীণকার্ড রয়েছে তারাও একই ধরনের বিপদের আশংকায় রয়েছেন। ৩ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে ভোটের কারণে রিপাবলিকান আর ডেমক্র্যাট উভয় পক্ষই এমন এক অবস্থানে রয়েছে যে, খেটে খাওয়া মানুষেরা পরিত্রাণের কোন পথই পাচ্ছেন না।

‘ন্যাশনাল লো ইনকাম হাউজিং কোয়ালিশন’র চীফ এক্সিকিউটিভ ডায়ানে ইয়েন্টেল বলেছেন আরো ভয়ংকর কথা। তার হিসাব অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে ৪০ মিলিয়ন আমেরিকানকে বকেয়া ভাড়ার জন্য উচ্ছেদের সম্মুখীন হতে হবে যদি করোনা রিলিফ-কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করা না হয়। এমন কঠিন একটি বাস্তবতার মুখোমুখী আগে কখনো স্বল্প আয়ের আমেরিকানরা হননি বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

উল্লেখ্য, এই সংস্থাটি ডেমক্র্যাটদের সাথে দেন-দরবার চালিয়ে ‘হিরোজ এ্যাক্ট’ বিলে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বরাদ্দ করিয়েছে। সেই অর্থ বকেয়া ভাড়ার বিপরীতে বাড়ির মালিকেরা পেতেন। কিন্তু রিপাবলিকানরা ইউএস সিনেটে হিরোজ এ্যাক্ট পাশ না করায় সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি অর্থাৎ অসহায় মানুষদের পরিত্রাণের প্রক্রিয়াটি মুখ থুবড়ে রয়েছে।