ওসি প্রদীপের রোষানলে পড়ে ২ তরুণের কারাবরণ

লকডাউনের সময় ঘটনাচক্রে কক্সবাজার গিয়ে বিপদে পড়েন আড়াইহাজারের দুই তরুণ। উদ্ধার পেতে পুলিশের সহযোগিতা নিতে গিয়ে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় গ্রেফতার টেকনাফ থানার সদ্য বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের রোষানলে পড়েন তারা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওসি প্রদীপের সাজানো মাদক মামলায় দুইজনকেই কারাবরণ করতে হয়। একজন মুক্তি পেলেও অন্যজন এখনও আছেন কক্সবাজার কারাগারে।

ভুক্তভোগী দুই তরুণ হলেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার সাতগাঁ ইউনিয়নের বাসিন্দা রায়হান মিয়া ওরফে প্রীতম (২৮) এবং উপজেলার পাঁচরুখী বেগম আনোয়ারা কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র লিংকন। তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই।

তাদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুনে এলাকায় একটি মারামারির ঘটনা জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে স্থানীয় সালিশে তাদের শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভয়ে কক্সবাজার পালিয়ে যান দুই ভাই। করোনা পরিস্থিতিতে হোটেল-মোটেল বন্ধ থাকায় বিপদে পড়েন তারা।

এক অটোরিকশা চালক সহযোগিতার কথা বলে তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণকারীদের আস্তানা থেকেই এক নারীর মোবাইল ফোন থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন প্রীতম। ওই ফোনকলের আগেই কৌশলে অপহরণকারীদের আস্তানা থেকে পালিয়ে যান লিংকন।

৯৯৯ থেকে কল পেয়ে পরে টেকনাফ থানার একজন এসআই প্রীতমকে অপহরণকারীদের ডেরা থেকে উদ্ধার করেন। পরে থানায় নিয়ে যাওয়া হলে ওসি প্রদীপ ওই দুই তরুণকে ইয়াবা মামলায় ফাঁসিয়ে দেন বলে অভিযোগ পরিবারের।

প্রীতমের বাবা হুমায়ুন কবির বলেন, ওরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়াতে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি। আড়াইহাজার থানায় একটি জিডিও করি আমরা। এরপর ফোন করে ছেলের মুক্তিপণ বাবদ এক লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

টাকা না দিলে ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি আড়াইহাজার থানার ওসিকে জানাই। ওসি ওই নম্বর ট্র্যাক করে জানান, মোবাইলটি টেকনাফ থানা এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

লকডাউনের মধ্যে ওসির পরামর্শে স্থানীয় জুয়েল, রফিকুল হামিদ জেনারেলকে নিয়ে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা হন তারা। কেউ যাতে পথে না আটকায় এ জন্য একটি স্লিপও দিয়ে দেন ওসি। সেটা নিয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত পৌঁছার পর তারা জানতে পারেন, কৌশলে টেকনাফের অপহরণকারীদের আস্তানা থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন লিংকন। এরপর তিনি কক্সবাজারে তার এক আত্মীয়র বাসায় ওঠেন। লিংকনের ছাড়া পাওয়ার বিষয়টি আড়াইহাজার থানা পুলিশকে অবগত করেন তারা। পুলিশের পরামর্শে লিংকনকে নিয়ে টেকনাফের দিকে তারা রওনা হন। যাতে অপহরণসহ সার্বিক ঘটনা টেকনাফ থানা পুলিশকে জানাতে পারেন লিংকন।

টেকনাফ থানায় যাওয়ার পর তারা জানতে পারেন, ৯৯৯-এ প্রীতমের ফোনকলের মাধ্যমে টেকনাফ থানার এক এসআই তাকে মুক্ত করে থানায় নিয়ে আসছেন। কিছুক্ষণ পর লুঙ্গি পরা অবস্থায় প্রীতমকে থানায় নিয়ে আসেন ওই এসআই। এরপর ওসির কক্ষে ঘটনার বিস্তারিত জানান ওই এসআই। এটা শোনার পর ওসি প্রদীপ বলেন, বাপসহ ওরা ইয়াবা কারবারি। লকডাউনের মধ্যে কেন ওরা টেকনাফ আসবে। সব কটারে ইয়াবাসহ চালান দে। এটা শোনার পর ওই এসআই বলেন, স্যার ৯৯৯-এ ফোনকলের পর ওকে উদ্ধার করেছি। ইয়াবার সঙ্গে জড়িত নয়। এরপরই এসআইকে থাপ্পড় মারেন ওসি প্রদীপ।

আড়াইহাজারের সাতগাঁ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হামিদ জেনারেল বলেন, প্রীতম ও লিংকন দুদজন আমাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। ঘটনাটি জানার পর প্রীতমের বাবার সঙ্গে কক্সবাজারে যাই। ওসি আমাদের অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করছিলেন।

এরপর প্রীতমের প্যান্টের পকেটে ৪০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে- এটা দেখিয়ে তাকে মাদক মামলায় চালান দেওয়া হয়। আর লিংকনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনের সাজা দেওয়া হয়। পুরো ঘটনা আড়াইহাজার আসনের এমপিকে জানিয়ে ওসি প্রদীপকে ফোন করতে অনুরোধ করি। এমপির অনুরোধও পাত্তা দেননি প্রদীপ।

প্রীতমের চাচা জুয়েল জানান, মিথ্যা মামলায় এখনও কক্সবাজারের জেলে রয়েছেন প্রীতম। আর লিংকন মুক্তি পেয়েছেন। ওসি প্রদীপ যে আচরণ করেছেন, এটা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। কলেজছাত্র লিংকন বলেন, দু’দিন থানায় আটকে রাখা হয়েছিল।

ওসি প্রদীপের পায়ে ধরেছি যাতে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো না হয়। এরপরও ১৫ দিনের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে আমার ভাইকে ছাড়েনি। যে চক্র আমাদের অপহরণ করেছিল তাদের মধ্যে জায়েদ উদ্দিন নামে একজনকে আটক করা হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে প্রদীপ বিশ্রী ব্যবহার করলেও জায়েদকে কিছু বলেননি।