এরদোয়ানকে থামাতে ‘যুদ্ধ খেলা’র কৌশলে ম্যাক্রোঁ?

সম্প্রতি পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বেশ সুসম্পর্ক গড়ে তুলছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, যা চোখে পড়ার মতো। এ বিষয়ে একবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শঙ্কা জানিয়ে বলেন, ম্যাক্রোঁ শিগগিরই পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যকার ভালো সম্পর্ককে সত্যিকার অর্থে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিবেন। ট্রাম্প এমন মন্তব্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে করেন, বা সেখানে তার কোনো স্বার্থে ভাটা পড়লো কিনা সেটি তিনিই বলতে পারবেন।

তবে এই অঞ্চলে ফরাসি প্রেসিডেন্টের আকার ইঙ্গিত ছাড়াই আগে থেকেই বেশ উত্তপ্ত। যদিও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাবে না যে, এমনটা এখনই আপনি একেবারে উড়িয়ে না দিলেও পারেন।

চলুন, এবার লেবানন থেকে একটু ঘুরে আসা যাক। এইতো ৪ আগস্ট, লেবাননের রাজধানী বৈরুত-এর গুদামে স্মরণকালের শক্তিশালী বিস্ফোরণে ২২০ জনেরও বেশি মানুসের প্রাণ ঝরে পড়েছে। নিখোঁজের সংখ্যাটাও কিন্তু কম নয়। আহত হয়ে হাসপাতালে বহু মানুষ।

বৈরুত বন্দরে ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নিরাপদ ব্যবস্থা না নিয়ে যেভাবে মজুত রাখা হয়েছিল তাতে আগুন ধরে ঐ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে, এমন কথা ভাসছে। বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সরকার বৈরুতে মজুত করে রাখতে দিয়েছিল – এ কথা জানার পর লেবাননবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জন্মেছে, যা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রুপ নিল।

কিন্তু কেন এমন লঙ্কাকাণ্ড তার কারণ এখনই বের না হলেও একটু পেছনে ফেরা যেতে পারে। ধ্বংস্তূপে দাঁড়িয়ে ভাবনার অথৈ সাগরে যখন লেবাননবাসী, তখনই ত্রাতার রুপ ধরে বৈরুতে পা রাখলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়ের ম্যাক্রোঁ।

বিস্ফোরণের মাত্র এক সপ্তাহ আগে মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম ব্যাখ্যা করেছিল যে, লেবাননের প্রতিনিধিদের কাছে অপদস্থ হতে হয় ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ ইভে ল দ্রিয়াঁকে। প্রস্তাব ছিল, প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন তার প্রশাসনকে বরাখাস্ত করে আবারও প্যারিসের ঔপনিবেশিক অধীনে চলে যাওয়া।

এদিকে বৈরুতের বিস্ফোরণ নিয়ে একটু ভাবা দরকার, যখন আপনি ইসারাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র পাশের দরজাটিতে অবস্থান করছেন, তখন রাশিয়ান জাহাজগুলিকে আপনার বিস্ফোরক উপকরণ দিয়ে ডুবিয়ে দেয়াটা উচিত হবে না।

যদি আপনি তা করেন, তবে আপনার সাবেক ঔপনেবেশিক শাসক আপনাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এ যেতে বলবেন। এবং আপনার দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য যে আদেশ দেবেন তা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় আপনাকে মাশুল দিতেও হতে পারে।

আর তাই হলো, বৈরুত’র ধোঁয়া না নিভতেই ছুটে আসেন ম্যাক্রোঁ। তিনি ঘোষণা দেন যে ফ্রান্স তার প্রশাসনের পরামর্শদাতা হিসাবে
লেবাননকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

এবার পূর্ব-ভূমাধ্যসাগরের রাজনীতির দিকে এগোনো যাক, এই অঞ্চলে একটি বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে লিবিয়া ও তুরস্কের যে চুক্তি রয়েছে ঠিক সমান আরেকটি চুক্তি গ্রিস-মিশর সমুদ্র চুক্তি। দু’দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল সংলগ্ন রয়েছে এবং তারা প্রায় এক বছর আগে জাতিসংঘের সঙ্গে তাদের চুক্তির বিষয়বস্তু নিবন্ধনও করে। তুরস্ক এবং লিবিয়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে সক্ষম হওয়ার কারণে হল, তাদের মহাদেশীয় বিভিন্ন বিষয়াদী একে অপরকে আকর্ষণ করে। তুরস্কের আনাতোলিয়ার উপদ্বীপের নিজস্ব কোনও মহাদেশীয় শেল্ফ না থাকলে গ্রিস এবং মিশরের সমান চুক্তি হতে পারে।

তুরস্ক তিনটি সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত। তাদের ৭ লাখ ৭০ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড এবং ৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুসারে, আঙ্কারার ২ লাখ ৬২ হাজার বর্গকিলোমিটার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। মিশরের আধা-সরকারী সংবাদপত্র আল-আহরাম এবং গ্রীক সিটি টাইমস ওয়েবসাইট (গ্রীকসিটিটাইমস ডটকম) দ্বারা প্রকাশিত মানচিত্রটি যদি আপনি দেখেন, তবে আনাতোলিয়ান মহাদেশীয় সাগরে থেকে খুব দ্রুত আধুনিক যন্ত্রব্যবহার করে মৎস আহরণ করতে পারে এরদোয়ান সরকার।

আর এজন্য তুরস্ক আশা করেছিল যে এথেন্স শিগগিরই তুর্কি রাজধানী আঙ্কারায় এসে তাদের আইনী এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করবে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোটাকিস এতটাই নিশ্চিত যে, কোনও চুক্তি হবে না বলে মনে হয়েছিল, তবে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে তিনি হেগের আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে)-র দিকে যেতে বসেন।

স্বাক্ষরিত সমুদ্র চুক্তির বিষয়ে একে অপরের সাথে কথা বলার আগেই গ্রিস এবং মিশর, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ’র সঙ্গে আলোচনা করে। তুরস্ক-লিবিয়ার সমুদ্র চুক্তি তাদের পক্ষে এই সুযোগকে অসম্ভব করে না দেয়া পর্যন্ত মিশর, গ্রিস, ইসরাইল এবং গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের মধ্যে কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে অংশীদারিত্বের জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেছিল ফ্রান্সের প্রধান তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান। এখন মনে হচ্ছে, তুরস্কের মহাদেশীয় শেল্ফ অদৃশ্য করার কোনও উপায় খুঁজে পেয়েছেন ম্যাক্রোঁ।

তাই ঘটলো, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে তুরস্ককে থামাতে সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ফ্রান্স। পূর্ব-ভূমধ্যসাগরে অবিলম্বে তেল ও গ্যাসের খোঁজ বন্ধ করতে হবে, আগ বাড়িয়ে তুরস্ককে সতর্ক করছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট যাক্রোঁ। সেখানকার পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখবে বলেন তিনি। এই নজর বলতে তিনি তুরস্ককে দমিয়ে রাখার কৌঁশলের পাশাপাশি মূলত সেখানে নিজেদের আধিপত্য কায়েম ও সুবিধা নেয়ার চেষ্টায় এই ফরাসি শাসক।

তবে আঙ্কারার দাপট ক্ষমতাসীন এরদোয়ানের হাতে থাকাকালে আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ফ্রান্স কিভাবে এই কাজটি সমপন্ন করে।