এবার তুরস্কের বিরুদ্ধে আরব ফ্রন্ট?

সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবণতা হলো, অ-আরব মুসলিম দেশগুলো ক্ষমতা অর্জন করছে যখন আরব মুসলিম দেশগুলোর, বিশেষত উপসাগরীয় আরবদের (অর্থাৎ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির প্রশাসনের অধীনে মিসর) প্রকৃত সক্ষমতা ভেঙে পড়ছে।

আরব দেশগুলো দ্রুত অমুসলিম পাশ্চাত্যের জিম্মায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, জড়িয়ে পড়েছে আরো বেশি পশ্চিমা নিরাপত্তা সুরক্ষায়, আরো বেশি নির্ভরশীল সম্পর্ক তৈরি করছে তাদের সাথে।

ঠিক এ সময় অ-আরব মুসলিম দেশগুলো ইসলামী বিশ্বকে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকারকে আরো দৃঢ়তার সাথে রক্ষার ভূমিকায় আসছে। এটি করছে এমন একসময় যখন আরব দেশগুলো উম্মাহর দাবি ও উত্তরাধিকার থেকে নিজেদের ক্রমাগতভাবে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

এটি হচ্ছে ফিলিস্তিন কাশ্মির রোহিঙ্গা ইত্যাদি ইস্যুতে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বাধীন নতুন ফ্রন্ট এটি স্পষ্টভাবে করছে এবং প্রকাশ্যে ইসলামী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পরিত্যাগ বা প্রত্যাখ্যান করছে।

অ-আরব মুসলিম দেশগুলো পশ্চিমের ‘সম্মুখ দেশ’ অবস্থানটিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে। একসময়, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং ইন্দোনেশিয়া সোভিয়েত কমিউনিজমের বিরুদ্ধে ‘দক্ষিণ অঞ্চল’ গঠন করেছিল এবং পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষা করেছিল। এই তিনটি দেশ তখন থেকেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। এখন এই দেশগুলো নিজস্ব একটি অবস্থান নির্মাণ করতে চাইছে।

তবে, যে দেশগুলোকে আমেরিকা, ইউরোপ এবং ইসরাইল হুমকিস্বরূপ মনে করে, তাদের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো, বিশেষত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তারা পশ্চিমা শক্তির সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে চাইছে এবং অন্যদের প্রতি হুমকিপূর্ণ বার্তা প্রেরণ করছে।

অ-আরব মুসলিম দেশগুলো বিদেশী আক্রমণ মোকাবেলার প্রয়াস চালাচ্ছে আর আরব মুসলিম দেশগুলো তাদের অঞ্চলের মধ্যে লড়াই করছে আর এটি করার সময় তারা পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তা চাচ্ছে।

অ-আরব মুসলিম দেশগুলো যখন ভেতরে ও বাইরে শক্তি সংগ্রহ করছে, লড়াই করছে, তাদের নিজস্ব শক্তি সক্রিয় করছে তখন আরব মুসলিম দেশগুলো বাইরে থেকে এ শক্তির ওপর আক্রমণ করছে, বিদেশী শক্তির সাথে মিলে তারা নিজেদের মধ্যে সঙ্ঘাত জোরালো করে তুলছে।

আরব দুর্বলতা এর অন্তর্নিহিত কারণ নয়, বরং তাদের প্রশাসন পশ্চিমাদের সাথে যে একতরফা নির্ভরশীল সম্পর্ক তৈরি করে সেটিই এর কারণ। এই সম্পর্ক প্রায় সবসময়ই আরব জনগণ এবং তাদের দেশগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল।

দু’জন ক্রাউন প্রিন্স ও এক স্বৈরশাসকের অক্ষ
নির্ভরতার সম্পর্কটি এখন নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে এবং এটি আরো ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে। এর নেতৃত্ব এখন মোহাম্মদ বিন জায়েদ (সংযুক্ত আরব আমিরাত), মোহাম্মদ বিন সালমান (সৌদি আরব) এবং সিসি (মিসর) দিচ্ছেন।

তারা প্রথম দিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরব সরকারগুলোকে ব্যবহার করেছিল। এই রূপটি তাদের আগ্রহের ভিত্তিতে নয়, বরং ইসরাইলের অগ্রাধিকার এবং মার্কিন পরিকল্পনার ভিত্তিতে ছিল। তারা তিন দশক ধরে এই প্রসঙ্গে লড়াই করে আসছে এবং সর্বদা হেরে গেছে। কারণ তাদের পরাজয়কে অনিবার্য করা হয়েছে।

সুতরাং, আরব-পারস্য সীমানাটি ইরান-ইরাক সীমান্ত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত টানা হয়েছিল। তারা ইরাক ও সিরিয়াকে হারিয়েছে এবং তারা এখন লেবানন ও ইয়েমেনকে হারাতে চলেছে।

অঘোষিত যুদ্ধ!
এবার প্রায় একই মানসিকতা নিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে আরব শক্তিকে সক্রিয় করা হচ্ছে। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, উপসাগরীয় দেশ এবং সিসির মিসরের সমন্বয়ে একটি ‘তুরস্ক-বিরোধী ফ্রন্ট’ প্রতিষ্ঠা করেছে।

এই মোর্চা আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন পরিচালনা, অর্থনৈতিক আক্রমণ, হত্যা ও মৃত্যুদ- কার্যকর করা- ইত্যাদির মাধ্যমে তুরস্ককে প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

তারা তুরস্কের সাথে লিবিয়ায়, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে, ককেশাসে, পারস্য উপসাগরে, লোহিত সাগরের আশপাশে এবং মধ্য আফ্রিকায় অঘোষিত যুদ্ধ চালাচ্ছে। এসব করতে গিয়ে তারা ইসরাইল, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ তথা বাস্তবে গ্রিস এবং গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।

পরের টার্গেট পাকিস্তান
এটা বেশ মজার বিষয় যে, একই ফ্রন্টটি সম্প্রতি পাকিস্তানকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে পাকিস্তানকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে।

পাকিস্তানে তাদের বিনিয়োগ বাতিল করা হচ্ছে, প্রদত্ত সহায়তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে, এবং কাশ্মীর সম্পর্কিত ভারতের পরিকল্পনাগুলোকে সুস্পষ্ট সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। কাশ্মীর ইস্যুতে ওআইসিকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। কাশ্মীরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণকে গভীরে নিয়ে যেতে ইসরাইলি ভূমিকায় সহায়তা দিতে কাজ করছে তারা। কাশ্মীরের মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের অবশিষ্টটুকু সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যখন ছিনিয়ে নেয়া হয় ঠিক তখনই বাহরাইন, আমিরাতে ভারতের নেতৃত্বকে সংবর্ধিত করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তুরস্কের পরে এই আরব দেশগুলো কি পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে চলেছে? এই প্রশ্নের জবাব সম্ভবত হ্যাঁ। এরপর কোন দেশ আসবে? খুব সম্ভবত শক্তিমত্তায় উদীয়মান মুসলিম শক্তি ইন্দোনেশিয়া।