এনআইডি জালিয়াতি: ডা. সাবরিনার বিরুদ্ধে মামলা করছে ইসি

তথ্য জালিয়াতি করে দুই এলাকায় ভোটার এবং দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেয়ায় কোভিড-১৯ টেস্ট নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান, সাবরিনার দ্বিতীয় এনআইডিটি ব্লক করে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালককে (ডিজি) ডা. সাবরিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কোন প্রক্রিয়ায়, কার সুপারিশে ডা. সাবরিনা দ্বিতীয়বার ভোটার হয়েছেন, ইসির কেউ কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে সহায়তা করেছেন কিনা- তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান সচিব মো. আলমগীর।

জাতীয় পরিচয়পত্র দুটিতে ভিন্ন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটিতে জন্মতারিখ ২ ডিসেম্বর ১৯৭৮। অপরটিতে ২ ডিসেম্বর ১৯৮৩। এক্ষেত্রে বয়স পাঁচ বছর কমানো হয়েছে। দুটি এনআইডিতে স্বামীর নামও ভিন্ন। একাধিক স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার হন সাবরীনা।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবরীনার একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাঠিয়েছে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনা খতিয়ে দেখছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

ইসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ভিন্ন তথ্য দিয়ে একাধিকবার ভোটার হওয়ার নেপথ্যে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা থাকতে পারে। দ্বিতীয়বার ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তার জন্য সুপারিশও করেন।

করোনাভাইরাস পরীক্ষার টেস্ট না করেই রিপোর্ট ডেলিভারি দেয়ার অভিযোগে জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরীনা চৌধুরীকে ১২ জুলাই গ্রেফতার করা হয়। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেকেজির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী একজন নাগরিক দুই এলাকায় ভোটার হওয়া ও দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র বহন করা অপরাধ। ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য বা ঘোষণা দিলে ওই ব্যক্তির ৬ মাস কারাদণ্ড, অনধিক দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। অসত্য তথ্য দেয়ায় নির্বাচন কমিশন চাইলে ডা. সাবরীনার বিরুদ্ধে মামলাও করার ক্ষমতা রাখে।

জানা গেছে, ডা. সাবরীনার দুটি জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি হচ্ছে- ১৯৭৮২৬৯……০০৩৯ এবং অপরটি হচ্ছে- ১৯৮৩২৬৯……০১৩৬ (ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে সবকটি ডিজিট প্রকাশ করা হল না)। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় দ্বিতীয়বার ভোটার হন তিনি।

প্রথম ভোটার হওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নাম ‘সাবরীনা শারমিন হোসেন’ ও দ্বিতীয় জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘সাবরীনা শারমিন হুসেন’ উল্লেখ করেছেন। তবে দুটিতেই ইংরেজি নাম একই রয়েছে। একটিতে বাবার নাম ‘সৈয়দ মুশাররফ হোসেন’ ও মায়ের নাম ‘কিশোয়ার জেসমীন’ উল্লেখ করেন। অপরটিতে মা-বাবার নাম পরিবর্তন করে ‘সৈয়দ মুশাররফ হসেন’ ও ‘জেসমিন হুসেন’ দিয়েছেন। একটিতে স্বামীর নাম ‘আর, এইচ, হক ও অপরটিতে আরিফুল চৌধুরী উল্লেখ করেছেন।

জন্মসাল ১৯৮৩ সালের সপক্ষে একটি জন্মসনদ নম্বরও জমা দেন ডা. সাবরীনা। জন্মসনদ নম্বরটি হচ্ছে- ১৯৮৩২৬৯২৫৩….৪১৭। দুটি জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানাও পরিবর্তন করেন ডা. সাবরীনা।

একটিতে মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিং সোসাইটির ঠিকানায় ভোটার হন। ঢাকা উত্তর সিটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের এ ঠিকানাটিকে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেন জাতীয় পরিচয়পত্রে।

অপরটিতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাড্ডা এলাকার প্রগতি সরণির আনোয়ার ল্যান্ডমার্কের ঠিকানায় ভোটার হন। এ জাতীয় পরিচয়পত্রে এ ঠিকানাটিকে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেন। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রে তার শনাক্তকরণের কোনো চিহ্ন উল্লেখ করেননি। অপরটিতে ‘চিবুকে তিলক’ শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুইবার ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য জালিয়াতির আশ্রয় নেন ডা. সাবরীনা। দ্বিতীয়বার ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন, তা সঠিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

কিন্তু একবার ভোটার হওয়ার পর তা গোপন করে দ্বিতীয়বার ভোটার হওয়া অপরাধ। এছাড়া দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র করার সময়ে তার আঙুলের ছাপ নেয়া হয়েছে। তবুও সার্ভারে তার দ্বৈত ভোটার হওয়ার তথ্য ধরা না পড়ায় আমরা বিস্মিত।

আমাদের ধারণা, দ্বিতীয়বার তিনি আঙুল উল্টোভাবে ছাপ দিয়েছেন অথবা প্রথমবারের আঙুলের ছাপে অস্পষ্টতা রয়েছে। এ কারণে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে যাচাইয়ের সময়ে তার দ্বিতীয় জাতীয় পরিচয়পত্র ধরা পড়েনি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে তার একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর পাঠানোর পর সার্ভারে চেক করে তা ধরা পড়ে।

উল্লেখ্য, ভোটার তালিকা আইন-২০০৯ অনুযায়ী, দ্বৈত ভোটার হওয়া বা চেষ্টা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্তত দুই বছর জেল ও জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে আইনে।