এক থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিতেই ভাগ্নে-ভাগ্নিকে খুন করেন মামা!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের শিশু শিফা আক্তার (১৪) ও মেহেদী হাসান কামরুলকে (১০) খুন করেছেন আপন মামা বাদল মিয়া। পূর্ব পরিকল্পিতভাবে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে প্রথমে ভাগ্নে কামরুলকে জবাই করেন তিনি।

পরে কামরুলের লাশ দেখে ফেলায় একই কায়দায় ভাগ্নি শিফাকেও হত্যা করা হয়। হত্যার পর কেউ যেন কিছু না বুঝে সেটা মনে করে নিজের মাথায় নিজেই পানি ঢালে মামা বাদল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালত ও পুলিশের কাছে বাদল হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে। বাদল জানিয়েছে, টাকা পাওনা সংক্রান্ত ঘটনায় বোন জামাই কামালের দেওয়া থাপ্পড় ও দেনা শোধ করতে না পারার দায় থেকেই তিনি ভাগ্নে-ভাগ্নিকে হত্যা করেন। পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক যে বর্ণনা বাদল দিয়েছে সেটি ডিএসবি শাখা থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

শিফা ও কামরুল বাঞ্ছারামপুর উপজেলার সলিমাবাদ ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামের সৌদি আরব প্রবাসী মো. কামাল হোসেনের সন্তান। বাদল মিয়া কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার খোদে-দাউদপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রবের ছেলে। তিনি বাহরাইন থাকতেন। দেশে আসার পর তিনি বেশিরভাগ সময়ই বোন জামাইয়ের বাঞ্ছারামপুরের বাড়িতে থাকতেন।

গত ২৪ আগস্ট রাতে নিজ বাড়ির খাটের নিচ থেকে কামরুল ও শিফার লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৬ আগস্ট রাতে বাদলকে ঢাকার সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বাদলকে আসামী করে বাঞ্ছারামপুর থানায় মামলা দায়ের করেন কামাল হোসেন।

বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদ হোসাইনের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বাদল। এর আগে পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। আদালত এক আদেশে বাদলকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, বাহারাইনে থাকা অবস্থায় ভগ্নিপতি কামাল হোসেনের কাছ থেতে ১৩ লাখ টাকা নেন কামাল। পরবর্তীতে তিন লাখ পরিশোধ করেন। বাড়ির উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বাকি টাকা চাইলে ২৪ আগস্ট দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে বাদল।

এলাকায় মারামারির মামলাসংক্রান্ত কারণে বোন জামাই কামাল হোসেনের বাড়িতে অবস্থান নেওয়া বাদল পূর্ব পরিকল্পিতভাবে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এর কিছুদিন আগে পাওনা টাকার জন্য বোন জামাই তাকে থাপ্পড়ও দেয়। মূলত টাকা দিতে না পেরে ও থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

বাদল পুলিশকে জানায়, ভাগ্নে কামরুল ‘মজা’ খাওয়ার জন্য মায়ের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে তার কক্ষে আসে। তখন তিনি উচ্চস্বারে গান বাজাচ্ছিলো। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কামরুলকে কৌশলে দুই হাত বেঁধে ফেলা হয়। পরে খাটের উপর শুইয়ের তার উপর চড়ে বসে। কামরুল মনে করে মামা তার সঙ্গে খেলা করছে। এরই মধ্যে বাদল বাম হাতে কামরুলের মাথা ধরে উঁচু করে ডান হাতে ছুরি নিয়ে জবাই করে।

হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ চাদর ও ঘরের অন্যান্য কাপড় দিয়ে পেচিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। খাট ও মেঝেতে থাকা রক্ত ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফ্যানের বাতাসে শুকানো হয়। সন্ধ্যা হয়ে গেলে কামরুলকে না পেয়ে বাবা কামাল হোসেন ও মা হাসিনা বেগম খোঁজখুঁজি করতে থাকে। হাসিনা বেগম রান্না হতে থাকা ভাতের মাড় গালার কথা মেয়ে শিফাকে বলে বেরিয়ে যায়।

এরই মধ্যে শিফা ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে খাটের নীচে লাশ দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করে। এসময় শিফার চুলের মুঠিতে ধরে বাথরুমে নিয়ে তাকেও জবাই করা হয়। একই কায়দায় লাশ খাটের নিচে রেখে দেওয়া হয়। ছেলের পর মেয়েকেও না পেয়ে মা হাসিনা বেগম বাসায় এসে চিৎকার দিয়ে উঠানে পড়ে যান। এ সময় কামাল হোসেনের পাশাপাশি বাদলও হাসিনার মাথায় পানি ঢালে। এক পর্যায়ে বাদল নিজের মাথায়ও পানি ঢালে যেন কেউ কিছু বুঝতে না পারে।

এদিকে বাদলকে থানায় যেতে বললে তিনি রাজি হননি। এক পর্যায়ের ভাগ্নে, ভাগ্নিকে খুঁজতে ফেরিঘাটের দিকে যায়। ভগ্নিপতি কামালকে ফেরিঘাটের ওপারে যাওয়ার পরামর্শও দেন। এতে কর্ণপাত না করে কামাল হোসেনসহ ফেরার পথে বাদল পালিয়ে যায়। মামা বাদলের পালিয়ে যাওয়াতেই সন্দেহ বাড়ে পুলিশের। এক পর্যায়ে তাকে ঢাকার সবুজবাগ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন বাদল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পুলিশ তৎপর ছিলো। যে কারণে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই রহস্য উন্মোচন হয়েছে। মূলত টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে ভগ্নিপতির থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিতেই পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।