উত্তর প্রদেশে জ্ঞানভাপি মসজিদ কমপ্লক্স ভাঙার ষড়যন্ত্র বিজেপির

আরও একটি মসজিদ ভাঙার ষড়যন্ত্র করছে ভারতের উত্তর প্রদেশের বিজেপি সরকার। জানা যায়, মসজিদ চত্বরে আগে কোনো মন্দির ছিলো কিনা তার জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অন্য দিনে ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ মন্দির সংলগ্ন জ্ঞানভাপি মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের জন্য স্থানীয় আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সুন্নী ওয়াকফ বোর্ড বারাণসীর জেলা আদালতে একটি রিভিশন পিটিশন দায়ের করেছে। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করবে কি করবে না সে বিষয়ে ৯ জুলাই সিদ্ধান্ত নেবে।

উত্তর প্রদেশ সুন্নি কেন্দ্রীয় ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষে অ্যাডভোকেট অভয় যাদব এবং তৌহিদ খান সিভিল জজ সিনিয়র ডিভিশনের গত ৮ এপ্রিলের আদেশকে রিভিশন আবেদনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেছেন, যেখানে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগকে পাঁচ সদস্যের কমিটির তত্ত্বাবধানে জ্ঞানভাপি মসজিদ কমপ্লেক্স খননের আদেশ দেয়া হয়েছিল।

আদালতের আদেশে বলা হয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পাঁচ সদস্য সমন্বিত একটি কমিটি মসজিদ চত্ত্বরের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখবে সেখানে আগে কোনো মন্দির ছিল কি না। ওই কমিটির দু’জন সদস্য হতে হবে মুসলিম। কিন্তু জ্ঞানবাপী মসজিদ কর্তৃপক্ষ আদালতের কাছ থেকে এ ধরনের রায় আশা করেননি।

সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের সদস্য মহম্মদ তৌহিদ খান সে সময়ে বলেছিলেন, ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সার্ভে কমিশনকে দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশ সমীচিন হয়নি বলেই আমরা মনে করি।’

অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’বোর্ডের সদস্য ও বিশিষ্ট সিনিয়র আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানিও প্রশ্ন তুলে বলেন, জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে একটি মামলা যখন এলাহাবাদ হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে এবং হাইকোর্ট সেখানে তাদের রায় মুলতুবি রেখেছেন, সেখানে কিভাবে সিভিল জজ এই আদেশ দিতে পারেন? তা ছাড়া ভারতে ১৯৯১ সালে পাস হওয়া ধর্মীয় উপাসনালয় আইনেও অযোধ্যা ছাড়া দেশের সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। বারাণসী সিভিল কোর্টের নির্দেশ সেই রায়েরও লঙ্ঘন বলে অনেকে মনে করছেন।

বারাণসী সিভিল কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে রিভিশন পিটিশন প্রসঙ্গে আইনজীবী অভয় যাদব বলেন, ‘রিভিশন আবেদনে আমরা দাবি করেছি যে আদালত এই পুরো মামলার শুনানি করার অধিকার রাখে না, বরং তা লক্ষনৌয়ের কেন্দ্রীয় সুন্নী ওয়াকফ বোর্ডের। এই বিষয়ে একটি মামলাও এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ১৯৯১ সালে পাস হওয়া ধর্মীয় উপাসনালয় আইনও ওই আদেশে লঙ্ঘন করা হয়েছে, এতে বলা হয়েছে যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার দিন ধর্মীয় উপাসনালয় যে অবস্থা ছিল সেভাবেই থাকবে। প্রায় চার শ’ বছরের পুরনো মসজিদটির খনের ফলে এর অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং ঘটনাস্থলে শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলাও বিঘ্নিত হবে।

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বারাণসী সিভিল জজ (সিনিয়র ডিভিশন) আশুতোষ তিওয়ারি জ্ঞানভাপি মসজিদ কমপ্লেক্সের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের নির্দেশ দিয়েছেন। একগুচ্ছ আবেদনের ভিত্তিতে ওই সিদ্ধান্ত এসেছিল। আবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে জ্ঞানভাপি মসজিদ নির্মাণের জন্য মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের একটি অংশ ভেঙে ফেলেছিলেন। ওই আবেদনে দাবি করা হয়, মসজিদটি যে জমিটির ওপরে নির্মিত হয়েছে সে জায়গাটি হিন্দু পক্ষের হাতে হস্তান্তর করতে হবে।

জ্ঞানভাপি মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মাসাজিদের যুগ্ম-সচিব সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ ইয়াসিন বলেন, ‘মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মিত হয়নি। এটি মন্দির থেকে একেবারেই আলাদা। যা বলা হচ্ছে সেখানে একটি কূপ আছে এবং এরমধ্যে একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে, এমন কথা সম্পূর্ণ ভুল। ২০১০ সালে আমরা কূপটি পরিষ্কার করেছিলাম, সেখানে কিছুই ছিল না।’

মুহাম্মাদ ইয়াসিন আরো বলেন, রাজস্ব দস্তাবেজই প্রাচীনতম নথি। এর ভিত্তিতে ১৯৩৬ সালে একটি মামলা দায়েরের পরের বছর ১৯৩৭ সালে এর সিদ্ধান্তও আসে এবং আদালতে এটি মসজিদ হিসেবে গৃহীত হয়। ‘আদালত বলেছিল যে এটি নিচ থেকে উপর পর্যন্ত একটি মসজিদ এবং এটি একটি ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’। পরে উচ্চ আদালতও এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।’

এই মসজিদটি ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগেই নয় বরং এটি ১৬৬৯ সালে যখন তৈরি হয়েছিল, সেই সময় থেকে এখানে নামাজ হচ্ছে এমনকি করোনার সময়কালেও তা অক্ষুণ্ণ রয়েছে’ বলেও জ্ঞানভাপি মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মাসাজিদের যুগ্ম-সচিব সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ ইয়াসিন মন্তব্য করেন।

সূত্র : পার্সটুডে