ইসরাইল-আমিরাত চুক্তি সর্বসম্মতভাবে প্রত্যাখ্যান ফিলিস্তিনের

নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে চুক্তিতে পৌঁছেছে ইসরাইল-সংযুক্ত আরব আমিরাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন ঘোষণায় বিস্মিত, হতাশ ফিলিস্তিনিরা।

চুক্তি অনুযায়ী নিরাপত্তা, পর্যটন, প্রযুক্তি, বাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে একমত হয় তেল আবিব-আবুধাবি। চুক্তির বিনিময়ে পশ্চিমতীরে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা স্থগিত করে ইসরাইল।
বৃহস্পতিবারের এমন ঘোষণায় অবাক হয়েছেন ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ এবং তাদের নীতিনির্ধারকরাও।

‘এই চুক্তির বিষয়ে আগে থেকে আমরা খুব একটা জানতাম না। বলেন, ফিলিস্তিনের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আহমেদ মাজদালানি। দ্রুততার সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো এবং চুক্তি ঘোষণার সময় বিবেচনায় আমরা সত্যি বিস্মিত। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিরা যখন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তখন এমন ঘোষণা এলো।

সাবেক ফিলিস্তিনি মন্ত্রী মুনিব আল মাসরি বলেন, শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান ২০০৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩০ বছর আবুধাবি শাসন করেন। তিনি সবসময় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছেন।

‘মরহুম শেখ জায়েদ ভাই আমার খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন। আমি জানি তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান নিতে পেরে কতোটা গর্ববোধ করতেন। আমি কখনো ভাবতেই পারিনি; আমরা জীবদ্দশায় এমনটা দেখতে হবে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত শুধুমাত্র সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অজুহাতে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে প্রতারণা করবে। এটা খুবই লজ্জাজনক। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।’

ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন, চুক্তির ঘোষণাটা হঠাৎই এসেছে। তবে তারা তাতে ততোটা অবাক নন।

‘আমরা মোটেই বিস্মতি হইনি। কারণ আমিরাতি সামরিক বাহিনী কখনোই সীমান্তে ইসরাইলি বাহিনীকে মোকাবিলায় প্রস্তু ছিল না।’ বলেন প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল ইনেশিয়েটিভের নেতা এবং পার্লামেন্ট সদস্য মুস্তাফা আল বারঘৌতি।

বারঘৌতি বলেন, ‘সম্প্রতি আমিরাতের কিছু আজব পদক্ষেপ আমরা দেখেছি। যেমন ইসরাইলে সরাসরি বিমান পরিচালনা। তাদের মধ্যে বাণিজ্য বিজ্ঞান-প্রযুক্তিখাতে চুক্তি হয়েছে এমন খবরও ফাঁস হয়। এটা পরিষ্কার যে আগের কর্মকাগুলো বৃহস্পতিবারের বিস্ময় হজমের প্রাথমিক ধাপ ছিল।

চুক্তি প্রত্যাখ্যান
প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথিরিটি, হামাস, ইসলামি জিহাদসহ স্থানীয় সব গোষ্ঠী বিবৃতি দিয়ে ইসরাইল-আমিরাত চুক্তির নিন্দা জানিয়েছে। প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের চুক্তি। একে পিঠে ছুরিকাঘাত বলে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি নেতারা।

‘আমরা ইতোপূর্বে জানতাম সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য তলে তলে কার্যক্রম চলছে। তবে বিষয়টা বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেভাবে স্বাবভাবিক এবং বৈধ করা হলো-তাতে আমরা হতাশ। এটা আমাদের এবং পুরো আরব জাতির পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। বলেন, ফিলিস্তিনের সাবেক সমাজ কল্যাণমন্ত্রী মাজিদা আল মাসরি।
আল বাঘৌতি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তিতে নতুন কিছু যুক্ত করা হয়নি। তাদের পরিকল্পনা প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা থেকে বহু দূরে।

‘তথাকথিত ট্রাম্পের শতাব্দীর সেরা চুক্তি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ এটি। ওই পদক্ষেপের লক্ষ্য ফিলিস্তিনি জাতিসত্ত্বা মুছে ফেলা। ফিলিস্তিনি, আরব এবং মুসলামনদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।চুক্তিকে ইসরাইলের জন্য ফ্রি গিফট বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনি নেতারা। এ চুক্তি ট্রাম্পকে এবং নেতানিয়াহুকে নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়তা করবে বলেও মত তাদের।

‘সময় এবং পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় বিষয়টি আন্দাজ করা খুব সহজ। বিনামূলে ইসরাইলকে সুবিধা দেয়ার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত এটি করেছে। বলেন, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সদস্য এবং প্যালেস্টাইন লিবারেশন ফ্রন্টের নেতা ওয়াসেল আবু ইউসুফ।

তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অত্যাচার-অবিচার এবং দখলদারিত্ব বাড়াতে ইসরাইলকে আরো ক্ষমতা দেয়ার লক্ষ্যে এ চুক্তি হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।একতরফা সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা পরিকল্পনা স্বাভাবিক করা
যদিও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ বলেছেন, ইসরাইলি সংযোজন পরিকল্পনা বন্ধের লক্ষ্যে এ চুক্তি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা বলেছেন, তার এ দাবির গ্রহণযোগ্যতা খুবই কম।

‘সংযুক্ত আরব আমিরাত সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছে বিভ্রান্ত করছে। তারা বুঝাতে চায় লজ্জাজনক এ চুক্তির মাধ্যমে তারা ফিলিস্তিনিদের পাশে রয়েছে এবং ইসরাইলের সংযোজন পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে। আসলে এটা চোখে ধুলো দেয়া ছাড়া কিছুই নয়।’ বলেন মাজদালানি।

আল মাসরি বলেন, ইসরালের সংযোজন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখন কোথাও নেই। বিশ্ববাসী দখলদারদের এ পরিকল্পনা বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। রুখে দিয়েছে।

‘ফিলিস্তিনিদের শোষণের চিত্র গোপন করার জন্য ইসরাইলের সংযোজন পরিকল্পনা একটি অজুহাত। সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্যকেউ ফিলিস্তিনের নাম ব্যবহার করে কোনো কিছু করতে পারে না।

তাদের এ চুক্তি জেরুজালেমে ইসরাইলের অবৈধ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ নতুন চুক্তিতে নতুভাবে ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরাইলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। ’ বলেন মাসরি।

আমিরাতের চুক্তি পশ্চিমতীরে সার্বভৌমত্ব বাড়ানো থেকে ইসরাইলকে বিরত রাখতে পারবে কী না এ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন ফিলিস্তিনি নেতারা।

‘ফিলিস্তিনের ভূমি আত্মসাত বন্ধের পরিবর্তে ইসরাইল তার অবৈধ কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে চলছে। বসতি নির্মাণ, বাড়িঘর গুড়িয়ে দেয়া, ইব্রাহিমি ও আল-আকসা মসজিদ এবং অঞ্চলটিতে পতিত জমিতে তেল আবিব তার আগ্রাসন বাড়িয়েছে।’ বলেন আল মাসরি।

ফিলিস্তিনিরা বলেছেন, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের ভূমি ইসরাইলের ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোজনের পথ খোলা রেখেছেন। মাসরি বলেন, এ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

‘নেতানিয়াহু সরাসরি বলেছেন, সংযোজন প্রক্রিয়া এখনো তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে। তারা তা বাতিল করেনি। অথচ আমিরাত বলেছে সংযোজন প্রক্রিয়া বাতিলের শর্তে সম্পর্ক স্বাভাবিকে চুক্তি হয়েছে। তেল আবিব আবুধাবির গালে চড় মেড়েছে। প্রমাণ করেছে আমিরাত ভুল।

আরবদের অবস্থান লঙ্ঘন
আমিরাতের চুক্তি, আরব শান্তি পরিকল্পনার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন আল বারঘৌতি। আরবদের অবস্থানে পেছনে থেকে ছুরি মেরেছে আবুধাবি। তাদের চুক্তি আমিরাতের সাধারণ মানুষের স্বার্থ এবং তাদের সাবেক শাসক শেখ জায়েদের অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক। বলেন বারঘৌতি।

‘ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট থেকে আরবদের অবস্থান পরিবর্তনের লক্ষ্য এ চুক্তি হয়েছে। এটি নেতানিয়াহুকে বলতে সুযোগ করে দেবে যে, ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে না সরেও তিনি আরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ উপায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। বলেন মাজদালানি।

আল বারঘৌতি শঙ্কা প্রকাশ করেন, জার্মানি, যুক্তরাজ্য যারা এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে তাদেরকে চোখ সরিয়ে নিতে অজুহাতের সুযোগ করে দেবে।‘কিন্তু আমি বিস্মিত বাহরাইনসহ আরব দেশগুলো এ চুক্তিতে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে। তারা কী ভুলে গেছে ফিলিস্তিনিদের এবং তাদের অধিকার?

তারা জেরুজালেম ভুলে গেছে? ভুলে গেছে ইসলামকেও? প্রশ্ন রাখেন বারঘৌতি।‘ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিনের ভূমি নিজেদের ভূখণ্ডে যুক্তের হুমকি দিচ্ছে না তারা দখলকৃত ভূমিতে অত্যাচার-অবিচারের মাত্রা বাড়িয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণ করা উচিৎ।’ বলেন আবদেদ আবু ইউসুফ।

সংগ্রাম চলবে
হতাশ হলেও, বৃহস্পতিবারের ঘোষণা ইসরাইলের দখলদারী অবসানে বিক্ষোভ, প্রতিবাদে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা।‘দখলদারী অবসানে আমাদের ত্যাগকে কখনো বৃথা যেতে দেবো না। মুক্তবিশ্বের সাধারণ মানুষের সহায়তায় আমাদের অধিকার এবং দাবি আরো জোরালোভাবে তুলে ধরবো আমরা।

’ বলেন আবু ইউসুফ।
মাজদালানি বলেন, আমিরাতকে জবাব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনি নেতারা। আবুধাবি থেকে অতিসত্ত্বর রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের কথাও ভাবা হচ্ছে। করণীয় সব বিষয়ে আমরা আলোচনা করছি।’

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ চুক্তির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে আরব জাতিকে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।

আবু ইউসুফ বলেন, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানইজেশন আবর রাষ্ট্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে আমিরাতের চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। যাতে আর কোনো আরব দেশ যাতে আমিরাতকে অনুসরণকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরবদের অবস্থান দুর্বল করতে না পারে তিনি বলেন, দখলকৃত ফিলিস্তিনের ভূমিতে ইসরাইলের চালানো বর্বরতা তদন্তে শিগগিরই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-আইসিসি একটি ঘোষণা দেবেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ইসরাইলি অবিচার বন্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের ক্ষমতায়নে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। একইসঙ্গে দখলদারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনাতে দ্রুত রুল জারির করতে আইসিসি’র প্রতি আহ্বান জানাই। বলেন আবু ইউসেফ।

আল মাসরি বলেন, আমিরাতসহ আরব জনগণের প্রতি আমাদের এখনো আস্থা রয়েছে। যদিও আমিরাতের জনগণ রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের কারণে মুখ খুলতে পারছেন না। আরব রাষ্ট্রগুলো এখনো এ ধরনের স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অজুহাত প্রত্যাখ্যান করে।