‘আমি জেল-ফাঁস কিছু মানি না’— ফোনে সেই প্রদীপের হুঙ্কার

আমার বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা লিখলে খবর আছে। এক পা আমার বাম পায়ের নিচে রেখে আরেক পা টেনে ছিঁড়ে ফেলমু। আমি জেল-ফাঁস কিছু মানি না। দেখেন না, ফরিদুল মোস্তফারে কী করেছি? উল্টোপাল্টা করলে ধরে এনে রান ফাইরা ফেলবো।’

কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার ওপর চালানো নির্যাতনের উদাহরণ দিয়ে কক্সবাজারের সাংবাদিক রহমত উল্লাহকে টেকনাফ থানার বহিস্কৃত ওসি প্রদীপ এভাবেই হুমকি দেন। ফাঁস হওয়া এক ফোন রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এতে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফার ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে সে কথা নিজেই স্বীকার করেছেন বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

এদিকে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মেজর সিনহার হত্যা মামলার আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপের সাজানো সব মামলায় জামিন পেয়েছেন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান। কক্সবাজার জেলা যুগ্ম দায়রা জজ ১ম আদালত নির্যাতিত ফরিদুল মোস্তফাকে জামিন আদেশ দেন।

বিনাবিচারে ১১ মাস ৫ দিন কারাভোগের পর কারামুক্ত হলেন ওসি প্রদীপের নির্মম নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান নির্যাতিত এই সাংবাদিক।

 

আদালত সূত্র জানায়, ‘টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেন টেকনাফের ওসি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করায় গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ওসি প্রদীপের নিজস্ব বাহিনী দিয়ে ঢাকা পল্লবী ভাড়া বাসা থেকে ধরে এনে সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তাফা খানের উপর চালানো হয় লোমহর্ষক নির্যাতন ও নিপীড়ন। এরপর অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, বিদেশি মদসহ ৬টি সাজানো মামলা দিয়ে পাঠানো হয় জেলে।

সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তাফা নিযুক্ত প্রধান আইনজীবী আবদুল মান্নান জানান, ৬ জুলাই ২০১৯ সালে ওসি প্রদীপের নির্দেশে টেকনাফের হ্নীলার দরগাপাড়ার মৃত তাজর মল্লুককে বাদি করে টেকনাফ থানায় জিআর ৫৭৭/১৯ চাঁদাবাজির মামলাটি দায়ের করেন। আসামি পক্ষে মামলার জামিন শুনানি করেন এড. মো. আব্দুল মান্নান, এড. আবুল কালাম ছিদ্দিকী, এড. রেজাউল করিম রেজা ও এড. সাইফুদ্দিন খালেদ।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বেলা ১২টায় কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল ফৌজদারী মিস মামলার মূলে জি/আর ১০২৫/২০১৯,ও জি/আর ১০২৬/২০১৯, পুলিশের সাজানো মামলায় ফরিদুল মোস্তফাকে জামিন দেন। এর আগে গত ১ মার্চ একই আদালত জি/আর মামলায় জামিন প্রদান করেন।

তিনি আরও বলেন, টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপের দালাল মৌলভী মুফিজ ইকবাল ও জহিরের চাঁদাবাজি ‘গায়েবি মামলা’ অভিযোগে টেকনাফ থানা মামলা নং-১১৫/২০১৯, কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল আদালত ১৩ আগস্ট জামিন প্রদান করেন। এছাড়া টেকনাফ থানা মামলা নং-৪২/২০১৯, জি/আর ৭৭৮/২০১৯ টেকনাফের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারহার আদালত জামিন দেন। এ নিয়ে ফরিদুল মোস্তফার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৬টি মামলায় জামিন পেলো।

জানা যায়, সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা টেকনাফ ও কক্সবাজারের মাদক ইয়াবা কারবারিদের নিয়ে পুলিশের সম্পৃক্ততা নিয়ে সিরিজ সংবাদ প্রকাশ করেন। এর জের ধরে ফরিদুল মোস্তফাকে নিধন মিশনে নামেন ওসি প্রদীপ দাশ। ফরিদ মোস্তফাকে যেখানে পাবে সেখানেই ক্রসফায়ারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই প্রাণের ভয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না ফরিদুল মোস্তফার।

গত বছর ২১ সেপ্টেম্বর মোবাইল ট্রেকিং করে রাজধানীর মিরপুর পল্লবী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে আটক করে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদুল মোস্তফাকে। সেখানে ওসি প্রদীপের হেফাজতে তিনদিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চলে।

পানির বদলে প্রস্রাব আর না খাইয়ে চোখে মরিচের গুড়া দিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তাক্ত করা হয়েছিল। হাত পায়ের নখ প্লাস দিয়ে টেনে উঠিয়ে ফেলা হয়। চোখ দুটো প্রায় অন্ধ করে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, বিদেশি মদ উদ্ধার দেখিয়ে তিনটি মামলা এবং ওসি প্রদীপের দালাল মৌলভী মুফিজ ইকবাল, জহির আহমদ, আবুল কালামকে বাদি সাজিয়ে আরো তিনটি চাঁদাবাজিসহ ৬টি সাজানো মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

অভিযোগ জানিয়ে ফরিদের স্ত্রী হাসিনা আক্তার বলেন, ‘গত বছর ২৬ জুন ওসি প্রদীপে বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন মোস্তফার ওপর। ওসি প্রদীপের ভয়ে কক্সবাজার সমিতি পাড়ার বাড়ি বিক্রি করে আমরা ঢাকায় মিরপুরে চলে যাই। কিছুদিন পর ঢাকা থেকে তুলে নিয়ে আসে টেকনাফ থানায়।

ওসি প্রদীপ নিজেই আমার স্বামী ফরিদুল মোস্তাফাকে লোমহর্ষক নিপীড়ন করে চোখে ও পায়খানার রাস্তায় মরিচের গুঁড়ো দেন। প্লাস দিয়ে আঙ্গুলের নখগুলো তুলে নিয়েছেন। হাতের প্রতিটি আঙুল গুড়িয়ে দিয়েছে। সে যখন একটু পানি খেতে চাইছিল-তখন তাকে প্রস্রাব ও টয়লেটের নোংরা পানি দিয়েছে খাওয়ার জন্য। ওসি প্রদীপ ফরিদুল মোস্তফাকে উলঙ্গ করে ভিডিও করেছেন। এমনকি পতিতা ডেকে এনে তার সঙ্গে ছবি তুলে ভাইরাল করার হুমকি দিয়েছে।’

ফরিদের বোন ফাতেমা জানান, ‘আমার ভাই গ্রেফতারের পরদিন রাতে ওসি প্রদীপ এসে বাড়ির ভেতর মদের বোতল, ইয়াব ও অস্ত্র রাখে। বেরিয়ে গিয়ে আবার মানুষকে জিজ্ঞেস করে ফরিদুল মোস্তফার বাড়ি কোনটা? আবার এসে বাড়ির গেটগুলো ভেঙ্গে ফেলে।

ঘরে ঢুকেই লাঠি দিয়ে আমাদেরকে মারতে থাকে। তখন মদ ও অস্ত্র উদ্ধারের নাটক করে আশেপাশের লোকজনকে সাক্ষী বানায়। ওই সময় প্রদীপ আমাদের বলতে থাকে— আমাকে চিনো? আমি টেকনাফে-মহেশখালীতে মানুষকে ক্রসফায়ার দিয়েছি।’